Menu

অভীক অর্জুন দত্ত

বিশ্বাসঘাতক/অভীক দত্ত 

 

প্রেম করলে ডাক পড়লেই চলে যাওয়া নিয়ম। নইলে যে ঝামেলাটা পোহাতে হয় সেটায় কোন প্রেমিকই যেতে চায় না।

ক্লাস শেষ হতে দেখি তিনটে মিসড কল। সুপর্ণা। হোয়াটস অ্যাপ খুলে দেখি মেসেজ “একবার আসিস আজ। জরুরি কোন কথা আছে”।

ভেবে দেখলাম তিনটে ক্লাস আছে এখনও। কৌশিককে হাতে পায়ে ধরে নিলাম “ভাই, দেখ প্লিস, প্রক্সিটা ঠিক করে দিস, এক প্যাকেট ফ্লেক কনফার্ম করছি একদম”। কৌশিক আমতা আমতা করে রাজি হয়ে যেতেই কলেজ থেকে বেরিয়ে বাস ধরে ফেললাম।

আজ দাড়ি কাটা হয় নি। সুপর্ণা দাড়ি দেখলে খুব রাগ করে। কিন্তু কী করব! আজ তো দেখা হবার কথা ছিলই না। শনি রবি দেখা করি আমরা। শনিবার সকালে গোটা সপ্তাহের দাড়িটা কাটি। তাতে মুখটাও কচি কচি দেখতে লাগে।

অন্যান্যদিন সুপর্ণা পরে আসে। আজ দেখি আগে আগে চলে এসছে। আমাকে দেখে ফ্যাকাসে ভাবে হাসল। আমি বললাম “কী ব্যাপার? হঠাৎ ডাক?”

সুপর্ণা বলল “বোস”।

আমাদের দেখা করার জায়গাটা বেশ সুন্দর। একটা পার্কের মধ্যে পুকুরের সামনে বসার জায়গা সুন্দর করে বাঁধানো। আমি বসতে সুপর্ণাও বসল। তারপর বলল “তোকে একটা কথা এবার বলতেই হবে”।

সুপর্ণার এই এক রোগ। ছোট ছোট ব্যাপারগুলোকে

এত সিরিয়াসলি বলবে যে প্রথমে মনে হবে কী না কী। গত পুজোয় একটা পাঞ্জাবী দেবে আমাকে। তার জন্য কত কথা। “দেখ কিছু মনে করিস না তোকে একটা কথা বলি” থেকে শুরু করে সে হাজার কথা।

আমি বুঝলাম এবারও সেরকম কিছু কথা, বললাম “কী বলবি? এবারও কি পুজোর জামা?”

সুপর্ণা কিছুটা ইতস্তত করে বলল “আসলে তোকে  যে জন্য ডেকেছি, সেটা একটু সিরিয়াস। আমাদের এবার ব্রেক আপ করতে হবে”।

আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকালাম। তারপর বললাম “মানে?”

সুপর্ণা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল “আসলে তোকে বলি নি, গত কয়েকমাস আগে আমার একটা সম্বন্ধ এসছিল। ছেলেটা মুম্বইতে চাকরি করে। দিদির শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়। আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম আমি কথা বলেই ছেলেটাকে ভাগিয়ে দেব। কিন্তু ওর সাথে একদিন আমি মিট করি। তোকে বলি নি সেটা। ছেলেটার সাথে কথা বলি।

অত্যন্ত ভদ্র ছেলে। অত বড় চাকরি করে একটুও অহংকার নেই। দেখ অরিত্র, আমরা এক বছর হল রিলেশনে আছি। কিন্তু আমার কোথাও গিয়ে একটা মনে হয়েছে, আমি তোর থেকে ওর কাছে অনেক বেশি সিকিওর থাকব। আমি ক’দিন ধরেই ভাবছিলাম তোকে বলি, কিন্তু বলতে পারছিলাম না। এখন মনে হচ্ছে তোকে আমি  

আসলে ফাঁকি দিচ্ছি।তাই তোকে আজ ডাকলাম”।

একসাথে এতগুলো কথা বলে থামল সুপর্ণা। আমি হাসলাম “এটা নিশ্চয়ই ইয়ার্কি?”

সুপর্ণা আমার দিকে তাকাল এবার “না, ইয়ার্কি না। দেখ অরিত্র, আমার ক’দিন আগে থেকেই মনে হচ্ছিল সমবয়সী প্রেমটা ঠিক আসলে হয় না। তোর মধ্যে এখনও অনেক চাইল্ডিশ ব্যাপার আছে। রুদ্রর সাথে কথা বললে বুঝতে পারতি ছেলেটা কতটা ম্যাচিওরড। আমার মনে হয় আমাদের দুজনের জন্যই আমাদের সম্পর্কটা একদিন বোঝা    হয়ে দাঁড়াত। এটা হয়ে আমাদের দুজনের জন্যই ভাল হল”।

আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম “আচ্ছা। আমি তাহলে আসি”।

সুপর্ণা আমার হাত ধরল “তুই বুঝতে পারছিস তো আমি কী বললাম?”

আমি আমার হাতে ধরে থাকা সুপর্ণার হাতের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, “বুঝেছি। আসছি রে। ভাল থাকিস”।

২।

মেসে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। তুমুল বৃষ্টিতে মেসের সামনেটায় জল দাঁড়িয়ে গেছে। পিয়াল, অরুণাভরা পড়তে বসে গেছে। সামনে সেমিস্টার পরীক্ষা।

আমাকে ঢুকতে দেখে পিয়াল বলল “আরে অরিত্র, আজ কোন চুলোয় গেছিলি ভাই?”

আমি পিয়ালকে দেখে হাসলাম “অ্যাপো ছিল”।

অ্যাপোর কথা বলতে পিয়াল আর অরুণাভ প্রতিদিনই “ও ও ও ও কাকা কাকা” বলে আওয়াজ দেয়। আজও দিল। কিন্তু আমার মুখ দেখে পিয়াল সম্ভবত কিছু একটা আন্দাজ করতে পারল। আমাকে বলল “কী হয়েছে রে? অ্যাপো মেরে এলে তো এমন ঝিমিয়ে থাকিস না! ঠিক কী হয়েছে বল তো!”

আমি চেয়ারে বসে কলেজের ব্যাগটাকে আমার খাটের দিকে ছুঁড়ে বললাম “ব্রেক আপ করে দিল”।

পিয়াল আমার দিকে খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে বলল “মানেটা কী?”

আমি শান্ত গলায় বললাম “ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ওর মনে হয়েছে সমবয়সী প্রেমটা ইমম্যাচিওরড। ছেলেটা ভাল। অনেক ডিসেন্ট। ক’মাস আগে থেকেই মিট করছে আমায় বলে নি। আজ বলল”। অরুণাভও পড়া ছেড়ে উঠে এসছিল। বলল “ইয়ার্কি  নাকি? ক’দিন একটা ছেলের সাথে ঘুরে হঠাৎ ভাল অপশন পেয়ে গেল আর সিমপ্লি তোকে কাটিয়ে দিল? আর তুই উদগান্ডুর মত সেটা শুনে চলে এলি? ”

আমি বললাম “আমি কী করতাম? মার ধোর? না অ্যাসিড বাল্ব ছুঁড়তাম? অদ্ভুত”।

পিয়াল অরুণাভর দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল “জাস্ট ভাব। এদের প্রেমের কথা! এই জামা কিনে দিচ্ছে, এই সারাক্ষণ ফোনে গুজগুজ করে যাচ্ছে, এই কলেজ বাঙ্ক মেরে চলে যাচ্ছে, আর আজ হঠাৎ করে স্রেফ কাটিয়ে দিল? একী ভাই!” 

অরুণাভ বলল “ভাই, অরিত্র অনেক ভাল। ওর জায়গায় আমি থাকলে মেয়েটার কপালে দুঃখ ছিল। যাই হোক ভাই, তুই একদম ভেঙে পড়িস না, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। এত প্রেম প্রেম প্রেম, এখন হঠাৎ এরকম যে করতে পারে, তার সাথে ব্রেক আপ হওয়া একদিকে শাপে বরই হওয়া। চিল মার ভাই। সেলিব্রেট কর ”।

আমি অরুণাভর দিকে তাকালাম। কিছু বললাম না।

৩।

গঙ্গাকে পবিত্র নদী বলে ধর্মগ্রন্থে। আমি যে গঙ্গাকে বেছে নিয়েছি সেটা অবশ্য ধর্মগ্রন্থের জন্য না।

 

আসলে কোন জিনিস ট্র্যাশবিনে ফেলে দিলে সেটা আবার দেখতে ইচ্ছা করে। গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলে সেটা দেখারও উপায় থাকে না।

সকাল থেকে সুপর্ণার দেওয়া জামা, খান বিশেক গ্রীটিংস কার্ড বার দশেক বার দেখে, একটা বাক্সে সব একে একে ভরলাম। তারপরে ট্যাক্সি করে গঙ্গায় গিয়ে সব ভাসিয়ে দিয়ে এলাম। কলেজ আর যাই নি।

কাল সারারাত হোয়াটস অ্যাপ খুলি নি। অন্যান্য রাতে হোয়াটস অ্যাপে কথার পর কথা জমত। কাল সব মিথ্যে মনে হচ্ছিল। রাত বারোটা নাগাদ ফেসবুকে ওর

প্রোফাইলটা আর দেখতে পেলাম না।

প্রথমে মনে হল ডি অ্যাকটিভেট করেছে। তারপর পিয়ালের প্রোফাইল থেকে খুললাম। দেখলাম আছে। বুঝলাম আমাকে ব্লক করে দিয়েছে।

আমার মা প্রায়ই দুঃখ করে বলে “আমার ছেলেটা যে এত ঠান্ডা কী করে হল কে জানে, একফোঁটা রাগ নেই ওর”।

আমি এতদিন কথাটার মানে বুঝতাম না। আজ হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম এত কিছুর পরেও সুপর্ণার ওপরে আমার এক ফোঁটাও রাগ হচ্ছিল না।

৪।

তিনদিন পরের কথা। ক্লাস করছিলাম মন দিয়ে। ঠিকই করে নিয়েছিলাম এখন থেকে আর কোনভাবেই কলেজ কামাই করব না।

অন্যান্য দিন মোবাইলটা সাইলেন্ট করে রাখি। আজ ভুলে গেছিলাম। ক্লাসের মাঝখানেই বেয়াড়াভাবে বেজে উঠল ফোনটা। স্যার ফোনের শব্দ শুনেই পড়া থামিয়ে আমাকে এক্কেবারে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন। আমি থতমত খেয়ে ফোনটা অফ করে ক্লাসের বাইরে এলাম। তারপর আবার অন করলাম। দেখি সুপর্ণা। প্রথমে বুঝলাম না কলব্যাক করব কী না,  শেষমেষ করলাম। 

একটা রিং হতেই ধরল ফোনটা “অরিত্র, একবার আসতে পারবি এখন?”

আমি কাটানোর চেষ্টা করলাম “কলেজ চলছে তো”।

“আয় প্লিজ। কথা আছে বেশ কিছু”।

আমি ফোনটা রেখে শূন্য দৃষ্টিতে একবার সেটার দিকে তাকালাম। তারপর বেরলাম কলেজ থেকে।

আগের দিনের মতই সুপর্ণা আগে থেকে চলে এসছিল। আমাকে আসতে দেখে বলল “একটা ফোন অন্তত এক্সপেক্ট করেছিলাম তোর থেকে। তোর কি কিছুই এল গেল না?” আমি বসলাম। বললাম “তুই তো যা বলার বলেই দিয়েছিলি। আবার কী?”

সুপর্ণা খানিকক্ষণ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল “তুই জানিস ডিসিশনটা নিতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছিল?”

আমি শান্তভাবে বললাম “হ্যাঁ, কিন্তু একই সাথে দুটো রিলেশন চালাতে কষ্টটা হয় নি”।

সুপর্ণা বেশ রাগী গলায় বলল “তুই বুঝবি না। আমায় কতটা শক্ত হতে হয়েছে এর জন্য”।

আমি বললাম না কিছু। সুপর্ণা বলল “আমি রাতে ঘুমাতে পারি নি। রুদ্রর সাথে কথা বলার সময়েও তোর কথা ভেবেছি বার বার। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে বার বার”।

সুপর্ণার দিকে তাকিয়ে বললাম “তুই এত চিন্তা করছিস কেন? তোকে আমি কোনদিন ব্ল্যাকমেল করব না। তোকে ভুলে গেছি আমি”।

সুপর্ণা এবার রাগবে না কী করবে কিছুই বুঝতে পারল না। বলল “আমি সেটা বলতে তোকে ডেকেছি ভেবেছিস?”

আমি বললাম “হ্যাঁ। এটাই। ব্লক করার পরে তোর মনে হয়েছে এখন তো অনেক উপায় আছে। যদি আমি রুদ্রকে বলে দি... তুই চিন্তা করিস না বলব না। এবার আসি?”

কেউ যদি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কিছু বলতে যায়, আর তাকে সেটা সরাসরি বলে দেওয়া হয় তাহলে তার প্রতিক্রিয়া দেখার মত হয়। সুপর্ণারও হল। একটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ও।

বললাম “তোর গিফটগুলো তোকে ফেরত দিলাম না। পরের দিনই গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছি। তাও যদি ফেরত চাস কতটাকা হয়েছে জানাস টাকা দিয়ে দেব”।

সুপর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল “আমি এতদিন জানতাম তুই আমাকে ভালবাসিস”।

আমি হাসলাম “ভুল জানতি”।

সুপর্ণা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।

আমি বললাম “উঠি?” সুপর্ণা কিছু বলল না। 

উঠেই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কী মনে হল দাঁড়ালাম। বললাম “ওহ, আসল কথাটা বলে যাই”।

সুপর্ণা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।

বললাম “এ মাসের পিরিয়ডটা না হলে ডাক্তার দেখাস শিগগিরি। আসলে সেই যে বকখালি গেছিলাম, সেদিনই তোর মোবাইল দেখে ছেলেটার ব্যাপারে জানতে পারি। ফেরার পথে তোকে যে কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল কিনে খাইয়েছিলাম সেটা কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল ছিল না। পাতি অ্যান্টাসিড ছিল। ভেবেছিলাম তোকে বলব না, কিন্তু জামাটার দামের কথা মনে হল। ভালই দাম ছিল। আসি রে”।  

সুপর্ণা বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি হাঁটতে শুরু করলাম।

মা ঠিকই আশঙ্কা করে, যাদের রাগ হয় না, তাদের থেকে ভয় পাওয়াই উচিত।

বেশ ভয় পাওয়া উচিত...