Menu

অভীক অর্জুন দত্ত

এক কুড়ি গল্প

এক কুড়ি গল্প লেখকের প্রথম বই, প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। বইটি নতুনরূপে আসছে।

প্রিবুক করতে 9474381728 এ ২০০ টাকা পাঠিয়ে (ফোন পে/গুগল পে/পেটিএম) ekkuri1@gmail.com এ আপনার নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার পাঠিয়ে দিন।

অথবা এই লিংক থেকে সরাসরি প্রিবুক করুন  

এক কুড়ি গল্প সম্পর্কে লেখকের কথা

এক কুড়ি গল্প সম্পর্কে কিছু কথা
এক কুড়ি গল্প আমার প্রথম গল্পের বই সবাই জানেন। কুড়িটাও বিক্রি হয় নি সবাই জানেন। গল্প, অণু গল্প মিলে ২০টা গল্প আছে যার ১১টা প্রেমের গল্প আর ৯ টা অন্যান্য বিষয় নিয়ে গল্প।
প্রেমের গল্পের মধ্যে আছে আমার জীবনের প্রথম লেখা গল্প আধটি ঘন্টা যেখানে গল্পের ন্যালাক্যাবলা নায়ক প্রেমিকার অপেক্ষায় থাকে আধ ঘন্টা। এই আধ ঘন্টা সে কী করে তা নিয়েই এই গল্প।
"আজ আমি কোথাও যাব না" এক মেয়ের গল্প, যে মেয়েকে সবাই হিংসা করে এবং যে মেয়ে তার হবুকে কথা দিয়েও দেখা করতে যায় না।
"অপেক্ষা" এক কালো মেয়ের গল্প যে কোনদিন কারো সাথে দেখা করতে পারে না দেখতে বাজে হবার জন্য।
"আসা যাওয়ার পথের ধারে" এক ছেলের গল্প যে চাকরিসূত্রে বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় ট্রেনে পরিচিত হয় এক পরিবারের সঙ্গে। এবং যথারীতি আমার গল্পের নিয়মানুসারে সে পরিবারে এক মেয়েও আছে  
"শুধু তোমারই জন্য" কলেজ প্রেম, "কখনও মেঘ" পেছন পাকা প্রেম, "দিনের শেষে" চাকরি পরবর্তী পেছন পাকা প্রেম ইত্যাদি ইত্যাদি। মানে বিভিন্ন পারমুটেশন কম্বিনেশন প্রেমের গল্প আছে।
বাকি ন'টা গল্পের মধ্যে "একটি ডিটেকটিভ গল্প" মোটেও ডিটেকটিভ গল্প না, মজার গল্প। "সত্যি ভূত, মিথ্যে ভূত", " বুবুনের কুট্টুস", "ফুস" এ ভূত আছে, "সময় ২০৫০", বা " ক্লোন সমস্যা" কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প।
সব লেখাই প্রথম জীবনের লেখা

এক কুড়ি গল্পের ভূমিকা এবং উৎসর্গপত্র

ভূমিকা এবং উৎসর্গপত্র-
এক কুড়ি গল্প আমার প্রথম প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ। কলকাতা বইমেলা ২০০৮ এ বইটি বইওয়ালা প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছিল। হার্ডকভার বই। আমি সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে পাঁচশো কপি ছাপিয়েছিলাম। কলেজের লাস্ট ইয়ার তখন। ‘আদরের নৌকা’ লিটল ম্যাগ বের করি। বইমেলায় টেবিলে আদরের নৌকা রাখি। খুব অর্কুট করি।
এই পাঁচশো কপি বইয়ের মধ্যে খুব বেশি হলে দশ বারো কপি বইমেলায় বিক্রি হয়েছিল। আমি কাউকে বই গছাতে পারতাম না। বাড়িতে একগাদা বই ডাই হয়ে পড়ে আছে। বাবা রেগে মেগে কাগজওয়ালাকে কিলো দরে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সে বইয়ের পাতা হয়ত কোথাও ঠোঙা হয়ে গেছে। 
এতদিন পরে পাঠকদের চাহিদায় বইটি আবার প্রকাশিত হল। বইটির কোন পরিমার্জন/পরিবর্ধন করা হল না। যেমনটি ছিল তেমনটি থাকল। প্রথম বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। এই বইটির প্রচ্ছদ করলেন তৌসিফ হক। 
কাঁচা হাতের লেখা, প্রেম প্রধানত। সময়কালটা ফেসবুক আসার আগে।
পাঠক পড়লে তৃপ্তি পাবেন না অতৃপ্ত হবেন বলতে পারছি না তবে বইটা বের করে আমি বেশ খুশি হয়েছি। আমার বাবা বেঁচে থাকলে আমার থেকেও বেশি খুশি হতেন। আত্মা বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে হয়ত বাবা এখনও সবার থেকে বেশি খুশি হতেন তার ছেলের এত বই বিক্রি হচ্ছে দেখে।
পাঠক পড়ুন, সঙ্গে থাকুন। আর কী বলব। প্রথম বইটার মুখবন্ধে লিখেছিলাম “সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আর ফালতু বকব না”। এবারেও তাই বললাম।
ভাল থাকুন।

অভীক 

গল্প প্রিভিউ

১) আধটি ঘন্টা

 

সামনের রেস্তোরাঁতে তার আসার কথা। সন্ধ্যা সাতটা টাইম।

আধঘন্টা বাকি।

আপাতত রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। প্রথম সাক্ষাৎ। একটু পাংচুয়াল হবার দরকার। বাজারে চারদিকে একটা ব্যস্ত ভাব। সামনের ক্যাসেটের দোকান থেকে গান ভেসে আসছে।

লেডি বার্ড সাইকেল আছে ওর। সবুজ রঙের। সেটা করেই সম্ভবত আসবে। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। হাত খরচ আর বই কেনার টাকা থেকে বাঁচানো টাকায় আজকের রেস্তোরাঁর খরচ মিটবে নাকি তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় আছি। আপাতত প্যান্টের বেল্টটা ঠিক আছে নাকি দশবারের মত দেখে নিলাম। তেরোবারের মত মাথার চুলটা আঁচড়ে নিলাম।

গরমটা এবার ভালই পড়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছি। আমাদের মফস্বলের বাজারটাতে মাঝখানে বেশ ফাঁকা জায়গা আছে। ভালো হাওয়া। মাঝেমাঝেই শরীর জুড়নো হাওয়া বইছে। তবু একটা চাপা টেনশনে ঘাম বেরোচ্ছে শরীর থেকে। দাদার কাছ থেকে চুরি করে গায়ে দেওয়া পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে এই ঘামের গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে ভেবে চিন্তিত হলাম।

ছ’টা পয়ত্রিশ। উফ! সময় যেন কাটতেই চাইছে না। সামনের রেস্তোরাঁতে ভাল ভিড় হয়েছে। খুব দ্রুত চাউমিন এগরোল ভাজা হচ্ছে। ভাত খেয়েছি সেই দুপুর দেড়টায়। এখন খিদে খিদে ভাবটা টের পাচ্ছি। ও ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। আমি পলিটিক্যাল সাইন্স অনার্স সেকেন্ড ইয়ার। হঠাৎ করে পরিচয়। এক সহপাঠিনীর বোন, খুব কৌশলে এখানে আসতে রাজি করিয়েছি।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গলা ধরে গেল। জল খেতে হবে।

এর আগে কোন মেয়ের সঙ্গেই এভাবে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয় নি।

একটা পুরো সন্ধ্যা। রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। খুব গরীব আমি নই। বাবা কাকার ভালই পয়সা আছে। কিন্তু বাবার থেকে টাকা বের করা খুব কঠিন কাজ। দাদা সবে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু ও আরও এক কাঠি ওপরে। দাদার জন্য মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। দাদা আমার মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার, মোটা টাকা মাইনে।

কিন্তু বাবার স্বভাব পেয়েছে। চাকরি পাওয়ার পর আমায় একটা দু টাকা দামের অগ্নি জেল পেন দিয়ে বলেছিল “ভাল করে পড়াশুনা করিস”।

একমাত্র মা-ই বাবাকে লুকিয়ে মাঝে মাঝে কিছু হাত খরচ আমায় দেয়। এতেই কষ্টেসৃষ্টে আমার দিন কাটে। কাউকে পকেটের পয়সা খরচ করে খাইয়েছি শুনলে দুদিনের ভাত বন্ধ করে দেবে বাবা।

গত বছর কলেজ থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে নিয়ে গেছিল। সবাই কী সুন্দর ঘুরে এসেছিল। বেড়াতে যাবার নাম শুনে বাবা বলেছিল “বেড়িয়ে কী হবে? মানুষ তো হতে পারবি না! যা পড়তে বোস!”...

...

Add Content/Layouts

২। শুধু তোমারই জন্য
 

 

এরকম সকাল বুঝি আর কখনও আসে নি। কুয়াশায় গোটা রাস্তাটা ভরে গিয়েছে। মেঘে আকাশ কালো হয়ে গেছে। সকাল ছ’টায় মর্নিং ওয়াকের জন্য বেরনোর কথা সন্দীপের। অথচ বাইরে বেরিয়েই এই প্ল্যানটা বাতিলের চিন্তা এল তার মনে। গত ক’দিন ধরেই মা বলে যাচ্ছে “তোর খুব ভুঁড়ি হচ্ছে রে, একটু হাটতে পারিস তো বাপু সকালবেলা”।
রোজ এড়িয়ে গেলেও আজ আর এড়াতে পারল না সে। মা টেনেটুনে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে। চোখ মুখ ধুয়ে ট্র্যাকশ্যুট পরে বেরোতেই ঘোরতর কুয়াশার মুখোমুখি হতে হল। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তার কপালটা বুঝি এরকমই। সব কিছুর জন্য প্রস্তুতি নেবার পর দেখা যায় যার জন্য এই প্রস্তুতি সেই কাজটাই হল না। নেট প্র্যাক্টিস ভালভাবে করে মাঠে নেমে বৃষ্টি হতে দেখলে যেমন লাগে সেরকম আর কী! 
নইলে তানিয়া কখনও এভাবে রিয়্যাক্ট করে! তানিয়াকে সন্দীপের বরাবরই পছন্দ। কলেজে নোটস দেবার ক্ষেত্রে কিংবা ল্যাব পার্টনার বাছার ক্ষেত্রে দুজনেই দুজনকে অটোমেটিক চয়েস করে নেয়। সন্দীপ দুজনের বন্ধুত্বটা বরাবরই অন্য চোখে দেখে এসছে। ক্লাসের বাকিরাও সন্দীপ তানিয়াকে কখনও আলাদা করে দেখে নি। গতকাল সরস্বতী পুজোর সময় কলেজের হল ঘরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তানিয়াকে প্রপোজ করে সন্দীপ। একঘর ছাত্র ছাত্রীদের সামনে হলুদ শাড়ি পরা তানিয়াকে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করেছিল। ভেবেছিল তানিয়া ভীষণ খুশি হবে। বাস্তবে দেখা গেল তানিয়া প্রথমে অবাক হয় এবং তারপরে গোটা ক্লাসের সামনে বোমটা ফাটায় “তুই কী করে এসব ভাবলি সন্দীপ? তোকে আমি বরাবর ভাল বন্ধু হিসেবে দেখে এসেছি। ছিঃ। তুই যে এতটা খারাপ আমি কোনদিন ভাবতেই পারিনি”। বলে একছুটে স্কুল ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ি চলে যায় তানিয়া। হতভম্ব, অপমানিত সন্দীপকে আর কেউ ঘাটায়নি। 
একে একে সবাই বেরিয়ে যায়। কোন মতে শরীরটা টেনে বাড়ি ফেরে সন্দীপ। তার থমথমে মুখ দেখে মা একবার জিজ্ঞাসা করেছিল “কী হয়েছে রে?”
সন্দীপ ‘কিচ্ছু না’ বলে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিয়েছিল। সে ভাবতেই পারেনি, তানিয়ার প্রতিক্রিয়া কোনদিন এরকম হতে পারে। তানিয়া ভীষণ সেনসিটিভ মেয়ে। যে কোন সময় সন্দীপের একটু ভুরু কুঁচকানো কিংবা মুখের কোন এক্সপ্রেশন পরিবর্তন হলেই তানিয়া বুঝে যায় সন্দীপ কী চাইছে। এতটা আঘাত সন্দীপ কখনও কল্পনাও করতে পারে নি। এতটাই দূরে ছিল সে তানিয়ার? ভাবতেই মনটা এই সকালের কুয়াশার মত দুঃখে ভরে যাচ্ছে তার। মাকে ডাকল সন্দীপ, “এই কুয়াশায় বেরোতে পারব না”।
মা রেগে বলল “ও সব অজুহাত ছাড়। অন্তত তিন কিলোমিটার হাঁট রোজ সকালবেলা। ঐ দেখ অনুপ আঙ্কেলরা দল বেঁধে বেরিয়েছেন। তুই ওদের সাথেই যা বরং”।
অনুপ আঙ্কেল তাকে দেখেই হাত নাড়লেন, “আরে সন্দীপ, গুডমর্নিং। চল চল। মর্নিং ওয়াকের জন্য কুয়াশা কোন বাঁধা হতে পারে না। চিত্ত যেথা ভয় শূন্য ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা। লেটস ওয়াক। ম্যাডাম আপনিও যেতে পারেন তো”।
মা মাথা নাড়ল “না অনুপদা। আপনার দাদার অফিসের তাড়া আছে। রান্নাবান্না করতে হবে। সন্দীপকে নিয়ে যান। আর একদম ঢিলে দেবেন না। চোখে চোখে রাখবেন”।
অনুপ আঙ্কেল “ওকে” বলে চেঁচালেন “চল”। অগত্যা বেরোতেই হল সন্দীপকে। অনুপ আঙ্কেলদের গ্রুপটা পাঁচজনের। স্বাস্থ্য ঠিকঠাক রাখতে শীত গ্রীস্ম সব সময়ে ওনারা অ্যাক্টিভ। ভোরে উঠলেই বাড়ির সামনের রাস্তায় ওদের সাথে দেখা হয়ে যায় সন্দীপের। অনেকবার আমন্ত্রণ এসেছে কিন্তু প্রত্যেকবারই কৌশলে এড়িয়ে গেছে সে। কিন্তু এবার আর কৌশল খাটল না। বাড়ির থেকে মা তাকে একরকম ঠেলেই পাঠিয়ে দিয়েছে। 
হাঁটতে তার কোনদিনই ভাল লাগে না। কিন্তু আজ সে হাঁটছে মন খারাপ কাটানোর জন্য। যে মন খারাপ খুব সহজে হয়ত মিটবে না। তার মন খারাপের সাথে আরেকটা প্রশ্নও মনে প্রায়ই উঁকি দিয়ে যাচ্ছে যে, সে এরপরে তানিয়ার মুখোমুখি হবে কী করে? কলেজেও তো বন্ধুদের করুণার পাত্র হয়ে উঠছে। কাল রাতে সুতীর্থ ফোন করে এমনভাবে সিমপ্যাথি জানাল যে মাথা গরম হয়ে গেছিল তার। কিন্তু কিছুই করার নেই। এখন সবার জ্ঞান শুনতে হবে। 
সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেল প্রায় সব পাড়াতেই একটা দুটো আছে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে অনুপ আঙ্কেলরা তানিয়াদের বাড়ির গলির দিকে ঘুরলেন। তানিয়াদের পাড়াতেও একটা পুজো হয়। সম্ভবত তানিয়া এখন গভীর ঘুমে। তানিয়ার কথা মাথায় আসতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে লাগল সে। তানিয়াদের বাড়িটা একতলা কিন্তু বেশ ছিমছাম সুন্দর। এর আগে অনেকবারই ওদের বাড়ি এসছে সন্দীপ। কাকিমা তাকে বেশ পছন্দ কেন। এক সপ্তাহ না এলেই ফোন করে খোঁজ খবর নেন। কাকিমা যদি জানতে পারেন... ভাবতে ভাবতেই সে দেখতে পেলো বাড়ির সামনে কাকিমা কাকু বসে চা খাচ্ছেন। 
তাকে দেখেই কাকিমা ডাকলেন “এই সন্দীপ, হাঁটবি পরে, আগে চা খেয়ে যা”।
সন্দীপ বুঝতে পারল না কী করবে। ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখেই তানিয়া হয়ত ভীষণ রেগে যাবে। সে কাটানোর চেষ্টা করল “না কাকিমা আমি বরং বিকেলে আসব”।
অনুপ আঙ্কেল বললেন “যা, আমরা ঐ পল্লী সংঘের গলিতে ঢুকছি। তুই বরং দশ পনেরো মিনিট পরে আমাদের জয়েন করিস”। অগত্যা দলত্যাগ করে তানিয়াদের বাড়িতেই ঢুকতে হল তাকে। 
তানিয়াদের বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট সুন্দর বারান্দা আছে। সেইখানেই কাকু কাকিমা চা খাচ্ছিলেন। সন্দীপ পৌঁছতেই কাকিমা বললেন “এত হেলথ কনশাস কবে থেকে হলি তুই?”
সন্দীপ একটা কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল “আর বোল না। মা জোর করে পাঠিয়ে দিল”।
কাকু হেসে বললেন “এখন উল্টো যুগ চলছে বুঝলে! ছোটবেলায় আমরা ভোর হতে না হতে ফুটবল নিয়ে মাঠে দৌড়তাম। আর এখন বুড়োরা সকালে হাঁটছে আর বাচ্চারা দশটায় উঠছে”।
কাকিমা বললেন “তাও তো সন্দীপ এখন তাড়াতাড়ি ওঠা শুরু করেছে। মামণি তো ন’টার আগে ওঠেই না”।
কাকু কাকিমাকে বললেন “সন্দীপ এসছে যখন, ওকে ডাকো তো। দেখাও যে সন্দীপকে দেখে শিখুক। খালি পড়ে পড়ে ঘুম!”
কাকিমা বললেন “ঠিক বলেছ। তাই যাই। সন্দীপের কথা বললেই উঠবে। নইলে সেই ওঠাতে গিয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে আমাদের”।
সন্দীপ সভয়ে বাঁধা দিল “না কাকিমা, ও ঘুমাক। আমি তো এখন এই চা খেয়েই দৌড় লাগাব আবার”। 
কাকিমা মানলেন না। “না দাঁড়া, মামণি রোজ ন’টায় ওঠে। এবার ওকে তুলতেই হবে। কাল সারা দুপুর ঘর বন্ধ করে ঘুমিয়েছে। এত ঘুমালে মোটা হয়ে যাবে যে”।
কাকিমা ঘরে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই ঘুমন্ত তানিয়াকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এলেন বলতে বলতে “দেখ কে এসছে”।
সন্দীপ টের পাচ্ছিল সে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। তবুও সে যতটা পারল স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল”।

 

৩। আজ আমি কোথাও যাব না

যাব ঠিক করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত গেলাম না। বৃষ্টির জন্যই হয়ত। সন্দীপটা হয়ত এখনও দাঁড়িয়ে আছে এই আশায় যে আমি এখনও যেতে পারি। খুব একটা খারাপ লাগছে না যে ছেলেটার সাথে আর দু মাস পর আমার বিয়ে, তার গোপন অভিসারে সাড়া দিলাম না বলে। কী ভাববে ও? আমি অহংকারী? ভাবুক। আমি এরকমই। যাবার আগে হঠাৎ করে ঠিক করে ফেলি আজ আমি কোথাও যাব না। ছেলেটা হয়ত কষ্ট পাবে। ঐ তো চেয়েছিল অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে প্রেমের স্বাদ পেতে। প্রেমই যখন করতে চাইছে তখন প্রেমের জ্বালাটাও পাক।
মোবাইলটা সুইচ অফ করে রেখেছি। নিশ্চয়ই এতক্ষণ ফোনের বন্যা বয়ে গেছে। পাগলের মত আইনক্সের সামনে হাঁটাহাঁটি করছে আর মোবাইলটা নিয়ে ফোন করে যাচ্ছে। ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করছে আর হয়ত মনে মনে আমায় গালাগাল করছে।
 
অথচ আজ সিনেমা দেখার প্ল্যানটা আমারই। আমিই ওকে বলেছিলাম আজকে আইনক্সে নিয়ে যাবার জন্য। কাল হঠাৎ মনে হয়েছিল।
কিন্তু আজ ইচ্ছা করল না।
আমি কোনদিন প্রেমে পড়িনি। সন্দীপের সাথে আমার বিয়ের কথা হয়েছে। ছেলেটা ভাল চাকরি করে একটা মাল্টিন্যাশনাল ব্যাঙ্কে। খুব হ্যান্ডসাম চেহারা। কথাবার্তাও বেশ ভাল। ভদ্রলোক। বুকের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। আর সেই চোখ থেকে ঝরে পড়ে আমার প্রতি অগাধ মুগ্ধতা। কলেজ লাইফে নিশ্চয়ই অনেক মেয়ে ওর প্রেমে পড়েছিল। সেই ছেলে আমায় দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিল। আমিও জানি আমার মত রূপ খুব কম মেয়ের আছে। আমি কলেজে বন্ধুদের থেকে শুরু করে প্রফেসরদেরও বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই পাত্তা দিই নি কাউকে। এমনকি এই সন্দীপের সাথে আমার বিয়ে হবে তবু আমি ওর প্রেমে পড়িনি। কী করে বুঝলাম? প্রেমে পড়লে কী আর ওর সাথে সিনেমা দেখতে যেতাম না আজ?
সন্দীপের সাথে আমার বিয়ের খবর পাকা হবার পর ও আমায় জিজ্ঞেস করেছিল আমার ওকে পছন্দ কি না। সবার কৌতূহলী চোখের সামনে নাও বলতে পারি নি। আমি অবশ্য মনে মনে
জানি এরকম কাউকে আমি ভালবাসি না। আমার পাগলামি আমার কাছেই থাক। সন্দীপ তারপর থেকে আমার ফোন নাম্বার নিয়ে রোজ দু তিন বার করে ফোন করা শুরু করল। একা একা বকে যায়। আমি মাঝে মাঝে ওকে কনফিউজ করে দিই। কথা খুঁজে পায় না বেচারা। তখন আমারই ওর জন্য খারাপ লাগে। ছেলেটা এত বড় কোম্পানিতে কাজ করেও বেশ ছেলেমানুষ। তবে এটা ভাবার কিছু নেই আমি ওকে ভালবাসতে শুরু করেছি। এত তাড়াতাড়ি ঐ ভালবাসা শব্দটা আমায় জব্দ করতে পারবে না।
কাল ফোন করে বলেছিল ও চেয়েছিল বিয়ের আগে আমরা আরও কাছাকাছি আসি। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ নয়। ব্যাপারটা যেন শেষ পর্যন্ত লাভ ম্যারেজই হয়। শুনে মনে মনে খুব হেসেছিলাম। মুখে ওকে চমকে দিয়ে বলেছিলাম কাল সিনেমা দেখতে গেলে কেমন হয়? কিছুক্ষণ চুপ করে বলেছিল, কখন? আমি বলেছিলাম দুপুর দুটোর দিকে। ও বলল,অফিস থেকে ম্যানেজ করে চলে আসবে। কালকে রাত পর্যন্ত আমি জানতাম যাচ্ছি। আজ সকালে বৃষ্টি শুরু হবার পর থেকে আর যেতে ইচ্ছা করল না। ওকে জানাইওনি। নিজের মোবাইলটা অফ করে বিছানায় শুয়েছিলাম। কে জানে, ছেলেটা বিয়ে ভেঙে দেবার কথা ভাবছে নাকি! তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না।
আচ্ছা আমি কি একটু অন্যরকমের? আমার পিসিরা আড়ালে আলোচনা করেন রূপের দেমাকেই নাকি আমার পাগলামির ঢঙ। প্রথমে কথাটা কানে এসে একটু খারাপই লেগেছিল। এখন সয়ে গেছে। সন্দীপের সাথে আজকের প্ল্যানটার কথা আমার বাড়ির কেউ জানে না। জানলে নিশ্চয়ই বাড়িতে আবার কানাকানি বেড়ে যাবে। একান্নবর্তী পরিবারে আনন্দ যেমন আছে তেমনি অন্য অনেক কিছু আছে যা আমার মত পাগলামির ঢঙ করা মেয়েরা বুঝতে পারে।
 
আমার মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর মন খারাপ হয়। সারাক্ষণ মনে হয় আমাকে কেন কেউ ভালবাসে না? রূপ না থাকলে আমার কী দাম ছিল? একটা কালো বাজে দেখতে মেয়ে হলে তো এরকম একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসত না।

ফুস

 

        “দামী প্যাণ্ট-শার্ট পরা লোকটাকে প্রথম দেখেছিলাম হাইল্যাণ্ড পার্কে। গাড়িটা পার্ক করে লিফটের জন্য দাঁড়াতেই কোথা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে হাজির হল লোকটা। কটা চোখ, চুলগুলি কালার করা। ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি। হাইটটা খুব বেশি হবে না। পাঁচ দুই-টুই হবে। গায়ের রঙ মাঝারি, চশমা পরা, হাল ফ্যাশনের স্টাইলিশ চশমা, তবু লোকটার গা থেকে মধ্যবিত্ত ছাপটা যাচ্ছে না। গায়ের চামড়াগুলি খসখসে মনে হয়েছিল। লোকটা আমার সাথেই লিফটে উঠেছিল। আমার মনে তখন চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল তাড়াতাড়ি শপিং সেরে টুইঙ্কলকে আনতে হবে। টুইঙ্কল আমার তেরো বছরের মেয়ে। পড়তে গেছে সন্তোষপুরে। আসার সময় ওকে নামিয়ে দিয়েছি ওর বন্ধু শিঞ্জিনিদের বাড়িতে। ওদের সায়েন্সের স্যার বেশিক্ষণ পড়াবেন না, তাই আমার তাড়াটা বেশি ছিল। যাইহোক, আমি লিফটে ১ নম্বর টিপে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। লোকটিও সম্ভবত ১-ই যাবেন। তাই আমার ১ নম্বরটা আড় চোখে দেখে নিয়ে আর ওদিকে হাত বাড়ালেন না। লিফট থেকে আমি নামতে যাব তখন লোকটা হঠাৎ আমার দিকে অদ্ভুতভাবে হেসে ‘এ যাত্রায়ও হলো না’ বলে চলে গেলেন। আমি হকচকিয়ে লোকটাকে ডাকতে যেতেই উনি যেন মন্ত্রবলে ভ্যানিশ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর কী হল জানেন? সেদিন মঞ্জুরী, মানে আমার স্ত্রী, যা যা লিস্ট করে দিয়েছিল তার কিছুই পেলাম না”।

 ‘একমিনিট’।

        জল খেলেন অভিজ্ঞানবাবু।

অভিজ্ঞানবাবুর সাথে আমার আলাপ গত পরশু মেট্রোতে। আমার গার্লফ্রেণ্ড সুচরিতাকে নেতাজি ভবনে নামিয়ে দিয়ে মেট্রোতে উঠতেই কপালজোরে একটা সিট ফাঁকা পেয়ে গেছিলাম। তখন সন্ধে সাড়ে সাতটা হবে। এই টাইমে কালীঘাটের যাত্রী বেশি থাকে। কালীঘাট থেকে মেট্রোটা ফাঁকা হয়ে যায়। টালিগঞ্জ পর্যন্ত একেবারে নিশ্চিন্তি। অভিজ্ঞানবাবুর পাশেই বসেছিলাম।

চেনা নেই জানা নেই হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে অভিজ্ঞানবাবু বললেন, ‘আচ্ছা আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?’ আমি হকচকিয়ে গেছিলাম। কলকাতায় সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় ভিড়ে ঠাসা মেট্রোতে ভূতের কথা বললে হকচকিয়ে যাবে যে কেউই, আমিও ব্যতিক্রমী নই। তবে বোঝাই যাচ্ছিল ভদ্রলোক চিন্তার অন্য একটা জগতে সম্ভবত বিচরণ করছেন যার জন্য চেনা জানার গণ্ডি ছাড়িয়ে দুম করে আমার ওরকম একটা কথা বলে দিয়েছিলেন। আমি ওনার প্রশ্নের উত্তর কয়েক সেকেণ্ড পরই দিলাম।

বললাম, ‘জানি না’।

‘জানি না মানে?’

অভিজ্ঞানবাবুকে যেন বেশ উত্তেজিতই মনে হয়েছিল। ‘আপনি জানেন না মানেটা কি? ভূত আছে কিনা জানেন না? আপনার বাড়ি কোথায়?’ আমার তখন ওনার প্রশ্নের ধাক্কায় বেসামাল অবস্থা। কোনোমতে বললাম, ‘হরিদেবপুর। যেখানে অজেয় সংহতির পুজো হয় সেখান থেকে দু’মিনিট আমার বাড়ি’। ভদ্রলোক আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমার নাম অভিজ্ঞান মুখার্জি। ঢাকুরিয়ায় থাকি। আপনাকে আমি একটা গল্প শোনাতে চাই, বলুন কবে সময় হবে?’

এক কুড়ি গল্প প্রি বুক করতে

বইটি প্রিবুক করতে 9474381728 এ ২০০ টাকা পাঠিয়ে ekkuri1@gmail.com এ আপনার নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার পাঠিয়ে দিন।

অথবা বইটি লিংক থেকে কিনতে এখানে ক্লিক করুন