Menu

অভীক অর্জুন দত্ত

পিডিএফ কিনতে হলে

উপন্যাসটি পিডিএফ কিনতে হবে যেহেতু এখন বই পাঠানোর ব্যবস্থা নেই। উপন্যাসটির পিডিএফ কিনতে 9474381728 এ দুইশো টাকা পাঠিয়ে নিচের ফরমটি ফিল আপ করুন। ২৫০টি পিডিএফ বিক্রি হবার পরেই পিডিএফটি আপনার মেইলে পাঠানো হবে। নইলে আপনার টাকা রিফান্ড করে দেওয়া হবে। বইএর জন্য অপেক্ষা করতে (বই ১৫-১৬ এপ্রিলের আগে পাঠানো যাবে না বা তার থেকেও দেরী হতে পারে) ২৫০ টাকা পাঠিয়ে ফর্ম ফিল আপ করে দিন। 

আমি পিডিএফটি কিনতে চাই, টাকা পাঠিয়েছি 

যখন এসেছিলে

১।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
পাহাড়ে বৃষ্টি, কোথাও যাবার অবস্থা নেই।
কুয়াশা আর মেঘে চারদিক ঢেকে আছে।
আঁখি জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলল “মা, বাবা সব সময় কেন ভুল ভাল টাইমে ছুটিগুলো পায়?”
সোম গম্ভীর হয়ে রিসেপশন থেকে আনা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। রাণী সেদিকে দেখে বললেন “তোর বাবাকেই জিজ্ঞেস কর। এই সময় কেউ পাহাড়ে আসে বল? আমার তো ভয় লাগছে রাস্তায় ধ্বস না নেমে যায়। বাড়ি ফেরা বন্ধ হয়ে যাবে তখন। দুনিয়ার লোকের গরমের ছুটি শেষ হল আর তোর বাবা এই বর্ষাকালে ছুটি নিল। তাও ভাল, ছুটি পেয়েছে, যা অবস্থা চাকরির, বাবাহ!”
আঁখি হেসে বলল “বেশ হয় তাহলে। বাড়ি কে যেতে চায়? আমি তো এখানেই থাকতে চাই”।
রাণী চোখ পাকালেন “হ্যাঁ, কলেজ তো আর যেতে হবে না। তুইও তো সেটাই চাস”।
আঁখি বলল “ও বাবা, কালকে সাইট সীনটা বাদ দিয়ে দিতে বল না। আমার তো ঘরেই বৃষ্টি দেখতে দারুণ লাগছে”।
সোম বললেন “বৃষ্টির মধ্যে যাবই বা কেন? আমারও দিব্যি লাগছে। আজ খিচুড়ি করছে। সঙ্গে মাংস”।
রাণী বললেন “এই হোটেলটা বেশ ভালো । কেমন সুন্দর কথা শোনে। আচ্ছা, এরা কি শুধু আমাদের তিনজনের জন্যই খিচুড়ি রাঁধবে? বাকিরা কী খাবে?”
সোম বললেন “বাকি আর দেখলে কোথায়? হোটেলে আর কেউ আছে নাকি!”
রাণী বললেন “ব্রেকফাস্ট টেবিলে একজনকে দেখলাম যেন?”
সোম বললেন “ওহ হ্যাঁ, এও আমাদের মতই পাগল। বর্ষায় পাহাড় দেখতে এসেছে”।
আঁখি বলল “বাঙালি? ঈশ, আমি সকালে ঘুমালাম দেখতে পেলাম না”।
সোম বললেন “এমনভাবে কথাটা বললি যেন বাঙালি মানে চিড়িয়াখানায় দেখতে যাবার কিছু। তুই লোক ভালবাসিস বললেই পারতিস, গ্যাংটকে থাকতাম”।
আঁখি ঠোঁট বেকিয়ে বলল “ছাতা। আমি সেটা কোথায় বললাম? মজা লাগে না? এরকম নির্জন জায়গায় বাঙালি!”
সোম বললেন “সিজনে আসলে আর মজা লাগত না। বিরক্ত লাগত। চারদিকে গিজগিজ করছে লোকে। আর সব বাঙালি। মনে হত ধর্মতলাটাকেই টেম্পারেচার কমিয়ে সিকিম বানিয়ে দিয়েছে”।
রাণী বললেন “আমার বাপু লোকজনই ভাল লাগে। একে নির্জন, তায় এরকম বৃষ্টি! কী যে ছাইয়ের চাকরি কর, পুজোতে ছুটি নেই, গরমের ছুটিতে ছুটি নেই, আত্মীয় স্বজনও এমন ভাবে তাকায় যেন পুলিশের চাকরি মানেই ঘুষের টাকা। আমার আর ভাল লাগে না”।
সোম বললেন “ভাল তো। তুমিও ঘ্যামসে থাকবে। পাওয়ারফুল লোকের বউরা যেরকম ঘ্যামে থাকে। তোমার বন্ধু সুজাতার বর ব্যবসা করে যা ঘ্যাম নেয় তুমি তো পুলিশের বউ হয়ে তার সিকিভাগও নিতে পার না”।
আঁখি বললেন “মা ঘ্যাম নেবে কী, মা সিরিয়াস হতে পারলে তো ঘ্যাম নেবে। মা শুধু সুযোগ খোঁজে হাসার। কিছু হলেই হাসি স্টার্ট। জানো বাবা সেদিন কী হয়েছে, আমরা সেদিন গড়িয়াহাট গেছি...”
রাণী বললেন “এই আমি কিন্তু বেরিয়ে যাব”।
আঁখি হাসতে হাসতে বলল “প্লিজ মা বলতে দাও, বলতে দাও। এখানে তো আমরা তিনজনই আছি। শোন না বাবা, গড়িয়াহাটে একটা দোকানে ব্যাগ কিনছি। দোকানদার শুরু করেছে তিনশো তে, আর আমি তিরিশে, যেই বলেছি, মা হাসতে শুরু করেছে। ব্যস, দোকানদার বুঝে গেছে, সে বলে এটা ফিক্সড রেট, কিছুতেই দাম কম করা যাবে না, আমি তো রেগে মেগে অস্থির, আর মা শুধু হেসেই যায়, বলে এত দরদাম তুই শিখলি কী করে?”
সোম বললেন “তোর মাকে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা আরও করুণ। ত্রিদিবদার বউ মারা গেছে। তোর মাকে নিয়ে দেখতে গেছি তার পরের দিন। ত্রিদিবদা হঠাৎ কেমন ভেবলে গিয়ে আমাকে বলেছে সোম আমি বিধবা হয়ে গেলাম। আমারও হাসি পাচ্ছিল কিন্তু অনেক কষ্টে জিভ কামড়ে সেটাকে চেপে ছিলাম। তোর মা ওখানেই হাসতে শুরু করে দিল। আমি এই মারি কি সেই মারি, কিন্তু তোর মাকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। ত্রিদিবদা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল হ্যাঁরে সোম, বউদি বোধহয় ওকে খুব ভালবাসত। কেমন একটা সেন্টিমেন্টাল হয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে হেসে ফেলছে দেখ। নেহাত ত্রিদিবদা মানুষটা খুব ভাল বলে। সব জায়গায় এরকম হাসি হাসলে আমাদের মার খাবার মত অবস্থা তৈরী হয়”।
আঁখি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। রাণী হাসতে হাসতে বললেন “আমার ওই বিধবা কথাটা শুনে এত হাসি পেয়ে গেল বিশ্বাস কর। আমি কিছুতেই আর আটকে রাখতে পারলাম না হাসিটা”।
কলিং বেল বাজল। সোম কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বললেন “ওই দেখ, লাঞ্চ এসে গেছে মনে হচ্ছে”।
আঁখি দরজা খুলল। এবং খুলেই অবাক হয়ে গেল, একজন যুবক কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, আঁখি বলল “বলুন”।
যুবক বলল “নমস্কার আমি অর্ক। আপনাদের কারও কাছে জুতোর ফিতে আছে?”
সোম বললেন “ওহ, আপনি। আসুন ভিতরে আসুন”।
আঁখি দরজাটা ছেড়ে দাঁড়াল। ছেলেটা তড়িঘড়ি ঘরের ভিতর ঢুকে চেয়ারের ওপর বসে বলল “আপনার কাছে জুতোর ফিতে হবে?”
সোম বললেন “জুতোর ফিতে নিয়ে তো ঘুরি না, কেন বলুন তো?”
ছেলেটা হতাশ হয়ে বলল “নেই! খুব সমস্যা হয়ে গেল”।
বলে আর কারও দিকে না তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাণী হাসতে শুরু করলেন, সোম ছেলেটির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বললেন “এ ছেলের নির্ঘাত মাথায় দু চারটে স্ক্রু ঢিলা আছে”।

“জুতোর ফিতে পেয়েছেন?” অর্ককে দেখে সোম জিজ্ঞেস করলেন। তারা লাঞ্চ করতে নেমেছেন ডাইনিং রুমে। অর্ক গোগ্রাসে গিলছিল।
সোমের প্রশ্ন শুনে বলল, “হ্যাঁ,হোটেলের এক ছেলের থেকে পেলাম”।
সোম একবার রাণীর দিকে তাকিয়ে তারপর অর্কর দিকে তাকালেন “জুতোর ফিতে দিয়ে কী করবেন?”
অর্ক বলল “আর বলবেন না, বুদ্ধ মূর্তির ওখানে জুতো খুলে ঢুকতে হত। আমার কী মনে হল, ফিতেটা খুলে জুতোটাকে র‍্যাকের সঙ্গে বেঁধে গেছিলাম। ফিরে দেখি জুতো আছে ফিতে নেই”।
আঁখি হেসে ফেলল খিলখিল করে।
অর্ক আঁখির দিকে তাকিয়ে বলল “সত্যি ভাবুন, এখানকার লোকগুলো কী অদ্ভুত! জুতোর ফিতে নিয়ে কী করবে? জুতো নিয়ে গেলেই পারতো”!
সোম বললেন “আপনি এই বৃষ্টির মধ্যে মূর্তির ওখানে গেছিলেন”?
অর্ক একটু দ্বিধান্বিতভাবে সোমের দিকে তাকিয়ে বলল “রেইন কোট আছে তো। ভাবলাম ঘরে বসে বসে কী করব! চলে গেলাম”।
রাণী হাসছিলেন। বললেন “আরেকটা জুতোর ফিতে কি জুতোতেই ছিল?”
অর্ক বলল “না, আরেকটা ফিতে পকেটে নিয়ে গেছিলাম”।
রাণী বললেন “সেটা জুতোতে থাকলে কী হত?”
অর্ক বলল “সেখানেই তো আমি জিতলাম। চোর ব্যাটা একটা ফিতে পাবে। আরেকটা আমার কাছে”। বলে খুব জিতেছে এরকম মুখ করে আবার খাওয়া শুরু করল।
আঁখিদের খাবার দেওয়া হচ্ছিল, রাণী বললেন “আপনি কি চাকরি করেন?”
ছেলেটা বলল “হ্যাঁ, আমার কাজের খুব চাপ। তাই আমি সাত দিন ছুটি নিয়ে ঘুরতে চলে এসছি। ফোনটাও অফ। কিছুতেই পাবে না”।
রাণী বললেন “শুধু রাবাংলাতেই থাকবেন?”
ছেলেটা বলল “আমার তো ইচ্ছা ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠব কিন্তু শুনলাম অনেক হ্যাপা আছে, তাই আর রিস্ক নিলাম না। আজ কাল তো রাবাংলায় থাকব। তারপরে দেখা যাক”।
রাণী আর আঁখি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখছিল, সোম অবাক গলায় বললেন “একবারে কাঞ্চনজঙ্ঘা? এটা একটু বেশি হয়ে গেছিল না?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ, পরে আমারও তাই মনে হয়েছে। আসলে আমি ভেবেছিলাম যাকে দেখার জন্য সবাই পাহাড়ে এসে এত হ্যাংলামি করে, যদি সরাসরি তার কাছেই যাওয়া যায়, মানে বুঝতে পারছেন তো আমি কী বলতে চাইছি?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, খুব হাই লেভেলের চিন্তা ভাবনা বোঝা যাচ্ছে”।
অর্ক বলল “সেটা হতে পারে, আমি ছোটখাট কিছু ভাবতে পারি না আসলে। এই দেখুন না, অফিসে ছুটি পাচ্ছিলাম না, আসার আগের দিন ছুটির অ্যাপ্লিকেশন আমার কিউবিকলে টেবিলের ওপর রেখে চলে এসেছি। ছুটি দিলে দে, নইলে যা ইচ্ছে কর। ফিরে দেখা যাবে”।
সোম বললেন “সে কী! চাকরি চলে যেতে পারে তো!”
অর্ক বলল “গেলে যাবে, চাকরি করে কে আর বড়লোক হয়েছে বলুন না। সেই এক কলকাতা, এক অফিস, যাও আর আসো, আসো আর যাও। লাইফে কোন আনন্দ নেই, অ্যাডভেঞ্চার নেই, আমি ঠিকই করে রেখেছি চাকরি গেলে যাক, তারপরে না হয় কাঞ্চনজঙ্ঘাতেই একটা বাড়ি করে থাকব। আচ্ছা আপনার কী মনে হয়, কোনটা বেটার হবে? কাঞ্চনজঙ্ঘা না এভারেস্ট?”
রাণী বললেন “এভারেস্টে কী করবেন? বাড়ি বানাবেন?”
অর্ক বলল “না না, বাড়ি বানানোটা বড় কথা না, বড় কথা হল এভারেস্টে ওঠাটা। সবাই কত ট্রেনিং করে, আমার তো আজকাল মনে হয় চাকরি বাকরি না করে মাউন্টেনিয়ারিং করলে ভাল হত। মা যদি ঝামেলা না করত তাহলে তাই করতাম”।
সোম বললেন “বাড়িতে কে কে আছে আপনার?”
অর্ক বলল “সবাই আছে। বাবা আছে মা আছে, কাকু কাকীমা, ঠাকুরদা। এবারে অবশ্য কাউকে জানিয়ে আসি নি। ওই অফিস স্টাইল, একটা চিঠি বাবার টেবিলে দিয়ে চলে এসছি। বলে কী না বিয়ে দেবে। কী ঝামেলার জিনিস বলুন তো!”
সোম বললেন “ওহ, তাহলে অফিসের ঝামেলার থেকে বিয়ের ঝামেলাটাই বড় মনে হল?”
অর্ক বলল “ওই তো, দুটোই। বিয়ে টিয়ে করলে আর পাহাড়ে আসতে পারব বলুন? আমার দুটো বন্ধু বিয়ে করেছে, নাকে দড়ি দিয়ে বউয়েরা তাদের ঘুরিয়ে যাচ্ছে, খ্যাপা নাকি”?
বলেই অর্ক হোটেলের ছেলেগুলোকে ডাকল “ও ভাই, দু পিস মাংস দাও তো, এরকম মাংস বানালে তো আর বাড়িও যাব না, এখানেই থেকে যাব”।
ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল “মাংস শেষ হয়ে গেছে”।
রাণী তার বাটিটা এগিয়ে দিলেন “এখান থেকে নিয়ে নিন, আমি বেশি মাংস খেতে পারি না”।
অর্ক নির্দ্বিধায় সেখান থেকে দু পিস চামচ দিয়ে নিয়ে বলল “বাঁচালেন। খাওয়ার সময় অত হিসেব করে খেতে পারি না। আজ রাত থেকে এদের বলে দিতে হবে আমার জন্য যেন দু প্লেট মাংস রান্না করে। পাহাড়ে এত হাঁটাচলা করতে হয়! শরীরে একটু বেশি প্রোটিন দরকার হয় তাই না?”
আঁখি বলল “আপনি হাটলেন কোথায়? গাড়িতে ঘুরছেন না?”
অর্ক অবাক গলায় বলল “সেকী! গাড়ি থেকে নেমে যে হাঁটতে হয়? সেটা কম নাকি?”
আঁখি কী বলবে বুঝতে না পেরে খিচুড়িতে মন দিল। সোম বললেন “কাল কী প্ল্যান?”
অর্ক বলল “কোন প্ল্যান নেই, গাড়িওয়ালা কিছু বলে নি এখনও”।
সোম বললেন “কাল আমাদের সঙ্গে চলুন, টি গার্ডেন যাব”।
আঁখি বাবার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকাল। অর্ক বলল “টি গার্ডেন যাবেন? আচ্ছা, যাব, আমার কোন চাপ নেই। একা একাও ঘোরাটা অবশ্য সত্যি বাজে আইডিয়া ছিল। এখন বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা বন্ধুকেও পেলাম না বুঝলেন? সবাই বউয়ের ভেড়া। শেষমেশ ওই আমাকে একাই আসতে হল”।
রাণী বললেন “একা একা এই বর্ষাকালে পাহাড়ে আসাটা একটু কেমন না?”
অর্ক বলল “কেমন তো বটেই? কিন্তু কী করব? গোটা গরম কালটা একটা প্রোজেক্টে ফেঁসে থাকলাম। এখন সময় হয়েছে!”
সোম বললেন “বেশ বেশ। আচ্ছা তাহলে কালকে তৈরী থাকবেন। আমি ডেকে নেব”।
ছেলেটার খাওয়া হয়ে গেছিল, টেবিল থেকে উঠে বেসিনের দিকে যেতে যেতে বলল “একদম, নো টেনশন”।
অর্ক বেরিয়ে যেতে আঁখি বলল “কী বাবা, যাকে তাকে বলে দিচ্ছ যাবার জন্য!”
সোম বললেন “আরে এই পাগলাটাকে নিয়ে গেলে ভালই হবে। সময় কেটে যাবে”।
আঁখি মুখ গোমড়া করে খেতে লাগল।
৩)
বিকেল নাগাদ বৃষ্টি ধরল তবে মেঘটা গেল না। রোদ ওঠে নি। একটা হিমশীতল হাওয়া বইছে।
সোম আর রাণী ঘুমাচ্ছিলেন। আঁখির ঘুম আসছিল না। সে একা একা ছাদে চলে এল। দেখল অর্ক একটা ক্যামেরা নিয়ে ছাদের ওপরে রাখা কয়েকটা টবের ফটো তুলে যাচ্ছে মনোযোগ দিয়ে। প্রথমে আঁখি ভাবল নীচে নেমে যাবে, পরক্ষণে তার মনে হল ঘরে ফিরেই বা কী করবে, ছাদের অন্য পাশটায় গিয়ে রাস্তায় মানুষজন দেখতে লাগল।
“এই ছাদ থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়, বুঝলেন?”
অর্ক ফটো তুলতে তুলতে তাকে বলল।
আঁখি একটু অবাকই হল। ছেলেটার মধ্যে কোন জড়তা নেই, কেমন সাবলীলভাবে কথা বলে যায়।
সে কিছু বলল না।
অর্ক বলে যেতে লাগল “এই যে ফুলগুলোর ফটো তুলছি, এটাই যদি কাঞ্চনজঙ্ঘা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকত, তাহলেই জমে যেত। জমছে না ঠিক। এত মেঘের কী দরকার ছিল”?
আঁখি বুঝল, সে কথা বলুক বা না বলুক অর্ক বকবক করেই যাবে। সে খানিকটা দায়সারা ভাবেই বলল “তাহলে যখন মেঘ থাকে না তখন এলেই পারতেন”।
অর্ক বলল “এবার তাই করব। শুনলাম শীতকালে এখানে মারাত্মক শীত পড়ে, তবে আকাশ পরিষ্কারই থাকে। সে সময় চলে আসব”।
আঁখি বলল “শীতে এলে আপনি টিকতে পারবেন না তো! অত ঠান্ডায় কেউ থাকতে পারে নাকি?”
অর্ক বলল “কেন পারে না? পারতে হবে। আরে পাহাড়ে তো লোকে শীতে থাকে, তারাও মানুষ, আমিও মানুষ না পারার তো কিছু নেই। আচ্ছা, আপনি একটু এই টবটাকে ধরে দাঁড়ান তো!”
আঁখি অবাক হল “কেন বলুন তো?”
অর্ক বলল “শুধু টবের ছবি তুললে কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে, আপনার ছবি তুললে ব্যাপারটা বেশ একটা ফটোগ্রাফি ফটোগ্রাফি মনে হবে। এই যে এই টবটা ধরুন”।
অর্ক একটা টব আঁখির দিকে এগিয়ে দিল।
আঁখি বলল “আপনার কি মনে হয় না আপনি একটু বেশি বেশি করছেন?”
অর্ক অবাক হয়ে বলল “আমি? কী বেশি করলাম?”
আঁখি এবার রেগে গেল “আপনার মনে হচ্ছে না আপনি একটু বেশি সরল সেজে থাকার অভিনয় করছেন”।
অর্ক থতমত খেয়ে টবটা রেখে আর একটাও কথা না বলে ছাদের অন্যদিকে চলে গেল। আঁখির মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। সে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রুমে ফিরে গেল।
রাণী উঠে বসেছিলেন। আঁখি ফিরতে ঘুম গলায় বললেন “কীরে কোথায় গেছিলি?”
আঁখি বলল “ছাদে গেছিলাম একটু”।
রাণী শঙ্কিত গলায় বললেন “একা একা?”
আঁখি বিরক্ত গলায় বলল “কী একা একা? আমি কি কচি খুকি নাকি?”
রাণী বললেন “তবু। দুমদাম চলে যাবি না। অজানা অচেনা জায়গা। তুই মেয়ে এটা ভুলে যাবি না। ছাদে একা ছিলি?”
আঁখি বলল “না ওই পাগলটাও ছিল”।
রাণীর মুড চেঞ্জ হয়ে গেল, তিনি আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন “কী করছে?”
আঁখি গম্ভীর মুখে বলল “ফটো তুলছে। গাছ, পাতা, পাথর যা পাচ্ছে তার ফটো তুলে বেড়াচ্ছে”।
রাণী বললেন “তোর ফটো তুলেছে?”
আঁখি রাগী গলায় বলল “আশ্চর্য মা! আমার ফটো তুলতে যাবে কেন? আমি কি গাছ, পাতা না পাথর?”
রাণী বললেন “তুই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সবাই তোর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে। আচ্ছা তোর সেই ছেলেটার খবর কী? কী যেন নাম? কী যেন...?”
আঁখি বলল “কে? প্রীতম?”
রাণী বললেন “হ্যাঁ হ্যাঁ প্রীতম। আজকাল কী খবর ছেলেটার?”
আঁখি বলল “মা! প্রীতম আমার বন্ধু! কতবার বলব বল তো! তুমি না এখনও সেই মান্ধাতার আমলেই পড়ে আছ”।
রাণী বললেন “ওহ, বন্ধু তাই না? ওকে দেখে কিন্তু মনে হয় না ও তোকে বন্ধু হিসেবে ভাবে”।
আঁখি বলল “তুমি একটু বেশি বেশিই ভাব মা”।
রাণী বললেন “হবে হয়ত। যাক গে, তোর বাবাকে ঘুম থেকে তোল তো। এখন বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে যখন এখানকার বাজার থেকে ঘুরে আসি অন্তত। সর্বক্ষণ ঘরে বসে থাকতে আর ইচ্ছা করছে না”।
আঁখি ডাকতে শুরু করল “ও বাবা, বাবা, উঠে পড় শিগগিরি। আমরা বাজারটা ঘুরে আসি। এখন বৃষ্টি বন্ধ আছে”।
সোম অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠলেন “উফ, তোরা যদি একটু শান্তিতে ঘুমোতে দিস”।
তিনজনে বেরলেন একটু পরে। হোটেল থেকে বেরিয়ে আঁখি একবার পিছন ফিরে দেখল অর্ক তখনও ছাদে ফটো তুলে যাচ্ছে। তাকে দেখে অন্য দিকে ঘুরে গেল। আঁখির হাসি পেয়ে গেল।
রাতে খেতে গিয়ে তারা শুনল অর্ক নাকি ঘরেই খেয়ে নিচ্ছে। আঁখি বুঝল বিকেলের ঘটনার জন্য ছেলেটা লজ্জা পেয়েছে হয়ত।
রাণী বললেন “ঈশ, কেমন একটা লাগছে না?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, ছেলেটার পাগলামি দেখতে ভাল লাগছিল। যাক গে, কাল সকালে তো আমাদের সঙ্গেই যাবে। চিন্তা করে লাভ নেই”।
রাণী বললেন “তাই হবে”।
আঁখি গম্ভীর মুখে খেয়ে নিল।
পরের দিন সকালে ড্রাইভার এসে সকাল সাড়ে সাতটায় নক করল। তারা সবে ঘুম থেকে উঠেছিল। সোম বললেন “আমি অর্ককে একবার নক করি। ব্যাটা নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে”।
রাণী বললেন “হ্যাঁ, যাও তো। ঘুমোলে তো বিপদ”।
সোম বেরিয়ে কিছুক্ষণ পরে ঘুরে এসে বললেন “ছেলেটা সত্যি পাগল”।
আঁখি অবাক চোখে বাবার দিকে তাকাল। রাণী বললেন “কেন কী হয়েছে?”
সোম বললেন “সকাল ছ’টায় চেক আউট করে চলে গেছে”।
রাণী অবাক গলায় বললেন “কোথায় গেল?”
সোম বললেন “হোটেলে তো কিছু বলে যায় নি। দেখো কেমন পাগল একটা”!
আঁখির খুব রাগ হচ্ছিল। কান্নাও পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে যেদিকে দু চোখ যায় হাঁটা দেয়।
৪)
আঁখির ইচ্ছা করছিল না যেতে। সে বলল “বাবা, আমার না ভীষণ শরীর খারাপ লাগছে। তুমি আর মা গিয়ে ঘুরে এসো”।
রাণী ফিক করে হেসে দিয়ে বললেন “কেন? অর্ক চলে গেল বলে মন খারাপ হয়ে গেল বুঝি?”
আঁখি রেগে মেগে সোমকে নালিশ করল “দেখো বাবা, মা সব সময় কেমন বাজে ইয়ার্কি করে”।
সোম কপট গাম্ভীর্যে রাণীর দিকে তাকিয়ে বললেন “তুমি না মা? ভুলে গেলে চলবে? আচ্ছা আজ মামণির যখন শরীর খারাপ লাগছে তখন না হয় আমরা সাইট সীনটা ক্যান্সেলই করে দি?”
আঁখি আপত্তি করল “না না তা কেন? আমার জন্য কেন তোমরা নিজেদের ঘোরাটা ক্যান্সেল করবে বল তো?”
রাণী বললেন “তুই না গেলে আমরা আর কী করব বল? আচ্ছা, তাহলে কালকের মত আজকেও শুয়েই কাটিয়ে দি। আজ একটু ওয়েদারটা ভাল ছিল, গেলে মন্দ হত না, এই যা”।
রাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আঁখি বিরক্ত হয়ে বলল “আচ্ছা, আচ্ছা, যাচ্ছি। উফ”।
সোমের মুখে হাসি ফুটল, বললেন “এই তো, তাড়াতাড়ি কর। অনেকক্ষণ লাগবে যেতে”।
আধঘন্টা পরে তারা বেরোল। আঁখি একটু গম্ভীর, সোম সেটা বুঝে রাণীকে বললেন “ছেলেটা একবারে বাজে বুঝলে? কোন আদব কায়দা জানে না, এভাবে শেষ মুহূর্তে পালাবার মানে কী”?
রাণী আড়চোখে আঁখির গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন “যা বলেছ, পাগল মানে বদ্ধ পাগল। দেখো গে সত্যি সত্যি হয়ত কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকেই চলে গেল”।
আঁখি বাবা মার কথা না শুনবার ভান করে মোবাইলটা বের করল। বন্ধুদের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে একবার ঢু মেরে নিল। প্রীতম বেশ কয়েকটা মজার মিম পাঠিয়েছে সেগুলো দেখতে থাকল। কিন্তু কিছুতেই সে হাসতে পারছিল না।
সোম বললেন “বলা যায় না। কালকে রাতেও খেতে এল না। কী হল বল তো হঠাৎ করে”?
রাণী ইউরেকা সুলভ মুখ করে বললেন “কাল তো মামণি ছাদে গেছিল, ওখানে আবার ওকে বকাঝকা করে ফেলিস নি তো? তোর যা মেজাজ!”
আঁখি মোবাইল থেকে চোখ না সরিয়েই বলল “অজানা অচেনা ফালতু লোকের সঙ্গে আমি কথা বলি না মা। তোমরাই তো শিখিয়েছ। ভুলে গেলে?”
রাণী বললেন “কী জানি, ছেলেটাকে আমার বেশ মজার লেগেছিল। আচ্ছা, জায়গাটা কী সুন্দর না?”
সোম বললেন “মাঝে মাঝে পাহাড়ের ভাঁজে মেঘ এসে বৃষ্টি পড়ছে, জায়গাটা দুর্দান্ত সন্দেহ নেই”।
রাণী বললেন “গাড়িটা দাঁড় করিয়ে কয়েকটা ফটো তুলতে পারতে তো”।
আঁখি বাধা দিল “একদম না, যেখানে যাচ্ছি সেখানে চল তো। দেরী করবে না একদম”।
রাণী ভয় পেয়ে চুপ করে গেলেন। সোমের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। সোম বললেন “আচ্ছা, আচ্ছা। আর কোন দেরী না। আচ্ছা আজ দুপুরে আমরা কী খাব মা?”
আঁখি বলল “যা ইচ্ছা। ওই স্কোয়াশের তরকারি আর ভাত খেলেও আমার কোন আপত্তি নেই”।
রাণী হাসতে শুরু করলেন। আঁখি রেগেমেগে বসে রইল।
তারা যখন চা বাগানে পৌছল তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সোম হতাশ গলায় বললেন “গোটা রাস্তা এত ভাল ছিল, এখানেই শুরু হয়ে গেল দেখো। আমাদের কপালে সুখ সইবে না”!
হঠাৎ রাণী চেঁচিয়ে উঠলেন “আরে, ওখানে অর্ক না?”
তাদের চোখ চলে গেল বাইরে। একটা বিরাট ছাতা মাথায় নিয়ে অর্ক গম্ভীর মুখে ফটো তুলে যাচ্ছে। রাণী একবার আঁখির দিকে তাকালেন। আঁখি অকারণেই হেসে উঠল, রাণী বললেন “হাসলি কেন?”
আঁখি বলল “হাসব না? এ কেমন পাগল দেখো? ছাতা মাথায় দিয়ে চা গাছের ফটো তুলছে”।
গাড়িটা পার্ক হয়ে গেছিল। সোম ছাতা মাথায় দিয়ে নেমে অর্ককে ডাকলেন “এই ছেলে, এদিকে এসো”।
অর্ক দেখতে পেল তাদের। এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে এল। “আরে আপনারা এসে গেছেন?”
সোম বললেন “তুমি তো আচ্ছা পাগল ছেলে হে! আমাদের তো এখানেই আসার কথা ছিল। তুমি আগে থেকে আসতে গেলে কেন?”
অর্ক একগাল হেসে বলল “এবাবা, ভেরি সরি বুঝলেন, আসলে আমাকে কাল একজন বাজারে বলল ভোরবেলা নাকি একটা ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দারুণ দেখা যাবে। আমিও সব ভুলে টুলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম”।
সোম বললেন “তাহলে চেক আউট করলে কেন? হোটেলে আর ফিরবে না? ওহ সরি সরি আমি তুমি করে বলে যাচ্ছি শুধু।”
অর্ক বলল “আহা, না না সেটা তো বলবেনই। আপনি আমার দাদুর বয়সী”।
রাণী গাড়ি থেকে নেমেছিলেন। অর্কর কথা শুনে হাসতে শুরু করলেন।
সোম ভ্রু কুঁচকে বললেন “দাদু বানিয়ে দিলে হে? তুমি তো মহা ত্যাঁদোড়!”
অর্ক জিভ কেটে বলল “এহ, বেশি সম্মান দিতে গিয়ে একটু বেশিই বলে ফেললাম। দাদু না হন, আমার কাকার বয়সী তো বটেই”।
রাণী হাসতে হাসতেই বললেন “দাদু থেকে কাকা বানিয়ে দিলে? আরেকটু দরদাম করলে তো নাতি বানিয়ে দিতে”।
আঁখি গাড়ি থেকে নেমেছিল। অর্ক সেদিকে দেখে তটস্থ হয়ে বলল “আচ্ছা, আপনারা ঘুরুন, আমি নামচি বাজার যাব”।
সোম বললেন “একদম না, তুমি এখানেই থাকবে, পালাবে না একদম”।
অর্ক কাঁচুমাচু মুখে বলল “হোটেলে তো চেক আউট করে এলাম”।
সোম বললেন “আবার চেক ইন করবে। কেন, কোথায় যাবার প্ল্যান করেছিলে?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল “আসলে চেক আউটের প্ল্যান ছিল না। কী মনে হল, গাড়ি যখন এল, আমি চেক আউট করে ফেললাম। কোথায় যাব তারও ঠিক নেই। নামচিতে শুনেছি একটা ভাল জায়গা আছে, ওখানে থাকতে পারি আজ”।
সোম বললেন “এরকম উদ্দেশ্যহীনের মত ঘুরে কী হবে? আচ্ছা তুমি ঘুরতে চাইছ যখন তখন নিজের মতই ঘোর”।
বৃষ্টি থেমে গেছিল।
রাণী বললেন “এই শোন, চল তো একটু কফি খাই, শীত লাগছে বেশ”।
সোম বললেন “তথাস্তু। চল। মামণি যাবি না?”
আঁখি বলল “না, আমি বরং এখানেই থাকি, বৃষ্টিটা থামল যখন তখন তো আর প্রবলেম নেই”।
রাণী বললেন “অর্ক তুমি যাবে?”
অর্ক মাথা নাড়ল “নাহ”।
রাণী সোমের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন “চল”।
আঁখি রাগী চোখে মার দিকে তাকাল।
দুজনে এগোলে অর্ক ক্যামেরা নিয়ে আবার চা বাগানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় আঁখি ডাকল “আপনি কি আমার কালকের রুড বিহেভিয়ারের জন্য চেক আউট করেছেন?”
অর্ক বলল “সিকিমে কিন্তু সেরকম চা বাগান নেই জানেন তো? রেয়ার খুব”।
আঁখি বলল “আপনি আমার কথার উত্তর দিলেন না কিন্তু”।
অর্ক বলল “খুব কফি খেতে ইচ্ছা করছে। ঈশ কী ঠান্ডা”!
বলে কফি শপের দিকে দৌড় লাগাল।
আঁখি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

তারা হোটেলে ফিরে এল বিকেল পাঁচটা নাগাদ।
সঙ্গে অর্ক। সামনের সিটে বসে সারাক্ষণ বকবক করে গেল। আঁখি গম্ভীর হয়ে বসে ছিল। রাণী অনেকবার আঁখিকে খুচিয়েছেন কিন্তু আঁখি একটা কথাও বলে নি। সোম খানিকটা বুঝেছেন তবে গোটা সময়টাই তিনি অর্কর সঙ্গে কথা বলে গেছেন।
অর্ক বলছিল ওর নাকি এবার মানস সরোবর যাবার ইচ্ছা। শুনে রাণী দু তিনবার কাশি আটকাতে গিয়ে বেজায় হেসেছেন। আঁখি তাতে রেগে গিয়ে রাণীকে চিমটি কেটে দিয়েছে।
হোটেলে ফিরে অর্ক আবার চেক ইন করল লজ্জা লজ্জা মুখে। রাণী এবং আঁখি ঘরে ঢোকার পর হোটেলের একজন বয় এসে বলল “সাহেব আপনাকে ওই স্যার একটু ডাকছেন”।
সোম বিরক্ত গলায় বললেন “দেখেছ? নিশ্চয়ই আবার কিছু পাকিয়েছে। দেখে আসি”।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “দেখো। যা পাগল”।
সোম হাসিমুখেই রওনা দিলেন।
অর্কর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। সোম ঢুকে দেখলেন অর্ক স্যুটকেসটা খুলতে পারছে না কিছুতেই। বললেন “কী হল?”
অর্ক মাথা চুলকে বলল “কম্বিনেশনটা হারিয়ে ফেলেছি। মানে ভুলে গেছি। কী করি বলুন তো?”
সোম বললেন “উফ, সত্যি। কোথাও লিখে রাখো নি?”
অর্ক বলল “নাহ। পুরো ভুলে মেরে দিয়েছি”।
সোম স্যুটকেসটার কম্বিনেশনটা ঘাটতে লাগলেন। প্রথম চেষ্টাতেই খুলে বললেন “দেখ কান্ড, এ তো কোন লকই ছিল না। তিনটে জিরো”।
অর্ক হাসতে লাগল, “দেখেছেন মিস্টার লাহিড়ী, কী কান্ড বলুন তো! রত্নাকর আগরওয়ালের স্যুটকেসেও সেই জিরো জিরো জিরো কম্বিনেশন লক ছিল। পুরো প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় লকটা খুললেন বলুন?”
সোম হাসছিলেন, অর্কর কথা শুনে তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, বললেন “তু... আপনি কে?”
অর্ক বলল “বসুন বসুন। ঘরে সোফা আছে। খারাপ হোটেলে তো আপনি উঠবেন না। এত গুলো টাকা যখন পেয়েছেন”।
সোম বুঝতে পারলেন এই শীতেও তিনি ঘামতে শুরু করেছেন। বললেন “আপনি কে বলুন তো?”
অর্ক হাসল “বেশি দিন হল জয়েন করিনি বুঝলেন? তবে সেন্ট্রাল ব্যুরো জায়গাটা বেশ ভাল। আমাদের মত পাগলদের জন্য খুব সুন্দর জায়গা”।
সোম পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে বললেন “আপনি কী চাইছেন?”
অর্ক বলল “আমি পুরো কেস হিস্ট্রিটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছি। আগামী কয়েকদিন আমি আপনার সঙ্গেই থাকব। ওই যেরকম পাগল সেজে থাকছি। খুব একটা খারাপ অভিনয় হচ্ছে না, বলুন? আরে আপনি বসছেন না কেন বলুন তো?”
সোম একটা সোফায় কোনমতে বসে পড়লেন। বললেন “দেখুন অর্ক বাবু...”
“আমার নাম সায়ন মিত্র, অর্কটা ছদ্মনাম। আচ্ছা আপনি অর্ক বলতে চাইলে বলে যেতে পারেন। নট ব্যাড। জানেন আমার মা এই নামটা দিয়েছিল। আমার বাবার আবার সায়নই পছন্দ ছিল। হ্যাঁ বলুন কী বলছিলেন”।
সোম বললেন “দেখুন সায়নবাবু, এই গোটা ইনভেস্টিগেশনে আমি শুরু থেকে ছিলাম না, চার্জটা আমি পরে টেক ওভার করি। আমি প্রথমে বুঝতেই পারি নি অত বড় পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স ছিল পার্টির। আমার কিছু করার ছিল না, আমি কী করব বলুন? অত প্রেশারে থাকলে...”
সায়ন পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে টেবিলে রাখল, বলল “পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স সব জায়গার সমস্যা লাহিড়ীবাবু, তা বলে আপনার মত অনেস্ট অফিসারদের যখন পা পিছলে যায় তখন থেকেই সমস্যাটা শুরু হয়। আপনি তো পুলিশ কোয়ার্টারসে থাকেন। খামোখা বড় স্বপ্ন দেখতে গেলেন কেন?”
সোম বললেন “আপনি এখানে একা এসছেন? আমার ফ্যামিলি এখানে বুঝতে পারছেন তো?”
সায়ন বলল “আমি একাই এসছি। আমি জানতাম আপনি ফ্যামিলি নিয়ে বেড়াতে এসছেন। এবং এই সময়টাই আপনি এমন কিছু বোকামি করবেন না যাতে আপনাকে শায়েস্তা করার কথা আমাকে ভাবতে হয়। বলুন মিস্টার লাহিড়ী, এই স্ক্যামে কে কে জড়িত?”
সায়ন কথাটা বলেই রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল কারও পায়ের শব্দ পেয়ে। রাণী চলে এসছিলেন, বললেন “আরে কী ব্যাপার? তুমি তো সেই কখন গেছ?”
সায়ন মাথা চুলকে বলল “আর বলবেন না, স্যারের থেকে ওনার অফিসের গল্প শুনছিলাম। আমাদের মত পিষেদের তো আর পুলিশ দেখার খুব একটা সৌভাগ্য হয় না। কী বলুন স্যার?”
সোম ম্লান হাসলেন। বললেন “হ্যাঁ, একেবারেই তাই। ছেলেটা একদম পাগলা। বুঝলে না?”
রাণী বললেন “চল বাজার ঘুরে আসি। কী অর্ক বাবু? যাবে?”
অর্ক বলল “নিশ্চয়ই। আমাকে আরেকজোড়া জুতোর ফিতে কিনতে হবে। আজকেও হারিয়েছি”।

আঁখি শুয়ে শুয়ে মোবাইল ঘাটছিল। রাণী এসে হাসতে হাসতে বললেন “আরেক কান্ড হয়েছে”।
আঁখি নির্লিপ্ত গলায় বলল “কী হয়েছে?”
রাণী বললেন “ছেলে স্যুটকেসের কম্বিনেশন ভুলে গেছে”।
আঁখি বলল “বাহ। খুব ভাল”।
রাণী বললেন “তুই এত গম্ভীর হয়ে গেলি কেন?”
আঁখি বলল “কিছু না। ভাল লাগছে না মা। সারাদিন এক জায়গায় থাকা”।
রাণী বললেন “শুধু তাই? আর কিচ্ছু না?”
আঁখি মোবাইলটা রেখে রাণীর দিকে তাকাল “আর কী? মানে কী বলতে চাইছ একটু খুলে বলবে?”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “আমি কী জানি! তুই যা বুঝবি”।
সোম এলেন। রাণী বললেন “কী ব্যাপার? খুলেছে স্যুটকেস?”
সোম বললেন “হ্যাঁ, অনেক কষ্টে। যা পাগল!”
রাণী বললেন “সত্যি! আবার বলছে আরও জুতোর ফিতে কিনবে, বোঝ!”
সোম বললেন “পাগল কত রকমের হয়”!
রাণী বললেন “তা হ্যাঁ গো, আজ রাতের মেনুটা কী ঠিক করলে?”
সোম বললেন “তোমাদের জন্য চিকেন কষা আর ভাত বলে দিয়েছি”।
রাণী অবাক হলেন “আমাদের জন্য মানে? তুমি কী খাবে?”
সোম বললেন “আজ একদম খিদে নেই। গ্যাস হয়ে গেছে আর কী! কিছু না খেয়ে কাটাব আজ”।
রাণী বললেন “কী যে বল! কিছুই তো খেলে না, একবারে রাতের খাবারটাই অফ করে দিলে?”
সোম বললেন “দুপুরে আলু পরোটা খেলাম না? একবারে ভরে আছে পেটটা”।
রাণী অবাক গলায় বললেন “আমিও তো খেয়েছি। সে তো কখন হজম হয়ে গেছে! পাহাড়ে তো আমার বার বার খিদে পায়। তুমি একটু কারবোভেজ খেয়ে নাও তো, গ্যাসটা নেমে যাবে”।
সোম বললেন “আরে মুড়ি খেয়ে নিচ্ছি। ওসব চিন্তা কোর না তো। মাঝে মাঝে ফাস্টিং ইজ গুড ফর হেলথ”।
আঁখি বলল “বাবা, কাল কিন্তু ভোরে উঠবে। ছাদ থেকে আমরা সান রাইজ দেখব”।
রাণী বললেন “রক্ষা কর, তুই গিয়ে দেখে আসিস। আর এই বৃষ্টির মধ্যে তুই সান রাইজ দেখবিই বা কী করে?”
আঁখি বলল “হোটেলের ছেলেটা তখন বলল না বৃষ্টিটা ধরেছে এখন! কপাল ভাল থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যেতে পারে কাল?”
সোম বললেন “আচ্ছা, তুই গিয়ে দেখে আসিস। তবে সাবধানে। সেরকম হলে সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসবি”।
আঁখি বলল “সেসব চিন্তা কোর না। আচ্ছা বাবা, আমরা কতদিন এখানে থাকব?”
সোম বললেন “কেন বল তো?”
আঁখি বলল “বোর লাগছে না?”
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “ও আসলে জানতে চাইছে অর্ক আমাদের সঙ্গে কদিন থাকবে”?
আঁখি রেগে গেল “উফ মা, তুমি কী শুরু করলে বল তো?”
সোম বললেন “আমি তো অর্ককে বলে এলাম যতদিন আমরা থাকব, আমাদের সঙ্গেই থাকতে। একা ছেলে কী না কী পাগলামি করে বেড়াবে পাহাড়ে”...
আঁখি বলল “কেন বাবা! ও নিজের মত ঘুরুক না, ওকে কেন জড়াতে যাচ্ছ?”
সোম বললেন “কেন মামণি? ও কি কিছু বলেছে তোকে?”
আঁখি বলল “না কিছু বলে নি, তবে বেশি পাগল টাগল নিয়ে ঘোরা ভাল না এই আর কী”!
রাণী বললেন “তুই থাম, তাছাড়া ছেলেটা যা দেখলাম আবার দেখবি কোনদিন আমাদের কিছু না বলে পালাবে। অত চিন্তা করিস না”।
আঁখি গুম হয়ে থাকল।
#
আঁখি এবং রাণী ডাইনিং রুমে পৌছে দেখলেন অর্ক দু প্লেট মাংস নিয়ে বসেছে। তাদের দেখেই বলল “আজ আর রিস্ক নিলাম না বুঝলেন? মাংসটা এরা যা বানাচ্ছে, মনে হচ্ছে অফিস টফিস ছেড়ে এখানেই থেকে যাব”।
আঁখি না শোনার ভান করে হেডফোন কানে গুজল। রাণী বললেন “তোমার বাড়ি থেকে ফোন করে নি?”
অর্ক বলল “করছে তো, ফোন করে করে জ্বালিয়ে মারছে, আমি ফোন ধরছি না এই যা। যা পাগল বাড়ির লোক সব”।
রানী বললেন “কেমন পাগল?”
তাদের প্লেট দিয়ে গেল হোটেলের ছেলেটা। রাণী বললেন “তোমার আর মাংস লাগবে? আমার থেকে দু পিস নিতে পার”।
অর্ক মাথা নাড়তে নাড়তে হাসল “না না, আজকে আর লাগবে না। আজকের জন্য দু প্লেট ইজ গুড। আচ্ছা আপনারা জেলুসিল এনেছেন তো? আমার আবার জেলুসিলটা ভাল স্যুট করে”।
রাণী হেসে দিলেন “খাবার আগেই কোন ওষুধ খাবে ঠিক করে নিচ্ছ?”
অর্ক বলল “সেটা তো ঠিক করতেই হবে। ওষুধটাই তো আসল। বিদেশ বিভুইয়ে ডাক্তার তো আর পাওয়া যায় না বলুন?”
রাণী বললেন “তা বটে। তুমি বাজার গেছিলে? কী কী কিনলে?”
অর্ক বলল “জুতোর ফিতে কিনলাম, মোজা কিনলাম দু জোড়া, সব থেকে বড় কথা মিষ্টি খেলাম বাজারের একটা দোকান থেকে। নিয়েও এসছি মাঝরাতে খিদে পেলে খাব বলে। দিব্যি খেতে কিন্তু মিষ্টিটা”।
রাণী অবাক হয়ে বললেন “মাঝ রাতে মিষ্টি খাবে?”
অর্ক কাঁচুমাচু মুখে বলল “হ্যাঁ আমার রাত তিনটেয় একবার ঘুম ভাঙে। তখন মনে হয় আকাশ খাই পাতাল খাই”।
রাণী বললেন “বাবা! কী কান্ড”।
অর্কর খাওয়া হয়ে গেছিল। সে উঠে বলল “আমি জেলুসিল আনতে যাব কিন্তু”।
রাণী বললেন “তুমি এখন যাও না। ও আছে তো ঘরে”।
অর্ক বলল “ওহ, ভুলেই গেছিলাম। ইয়েস ইয়েস। আচ্ছা এখনই যাচ্ছি”।
হাত মুখ ধুয়ে অর্ক শিস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল।
রাণী হাসতে হাসতে বললেন “পুরো পাগল ছেলেটা”।
আঁখি বলল “এত কথা বলার কী দরকার?”
রাণী বললেন “তোরই বা এত গম্ভীর হবার কী দরকার?”
আঁখি রাগী রাগী মুখ করে বসে রইল।
৭)
“জেলুসিল আছে নাকি লাহিড়ীবাবু?” সোম দরজাটা খুলতেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল অর্ক। সোম কয়েক সেকেন্ড অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন “আসুন, আছে”।
অর্ক ঘরে ঢুকল। সোম বললেন “বসুন, এই ড্রয়ারে রেখেছি জেলুসিল”।
অর্ক একটা চেয়ার টেনে বসে ঘরটা দেখতে দেখতে বলল “খেতে গেলেন না কেন? আমার ভয়ে?”
সোম বললেন “আমার ডাইজেশন প্রবলেম আছে। জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই করে কি লাভ আছে কোন?”
অর্ক বলল “তা বটে। আচ্ছা আমি আরেকটা জিনিস ভাবছিলাম। সেভাবে অবশ্য খুব এক্সপেনসিভ কোন হোটেলে ওঠেন নি আপনি। জায়গাটাও দেশেই চুজ করলেন। কলকাতার কাছেই। আপনার বন্ধু মিত্র তো ইউরোপ ট্যুরে গেছে তাই না?”
সোম জেলুসিলের স্ট্রিপটা অর্কর হাতে দিয়ে বললেন “হু। গেছে”।
অর্ক একটা জেলুসিল মুখের ভিতর চালান করে দিয়ে বলল “আপনি গেলেন না কেন?”
সোম হেসে বললেন “বহুদিন পর ছুটি পেলাম। ইউরোপ না, আমার ঘরের কাছেই কোথাও একটা মেয়ে বউয়ের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কলকাতায় থাকলে তো ওদের সময় দেওয়া হয় না”।
অর্ক মাথা নাড়ল, “দ্যাটস গুড। সময় দেন না, দিতে চান এসব ভাল। আচ্ছা, আমাকে এবার বলবেন একটু রত্নাকরের কেস ডিটেলসটা? আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই”।
সোম একটু ইতস্তত করে বললেন “বলতে চাই, কিন্তু ওরা তো যে কোন সময় চলে আসবে...” সোমের চোখটা দরজার দিকে চলে আসল।
অর্ক বলল “আপনি বলতে থাকুন। আমি অ্যালার্ট থাকব। আপনিও থাকবেন। বলুন”।
সোম বললেন “তিন মাস আগের কথা। আমি বাড়িতে ছিলাম। এই সময় হেড অফিস থেকে একটা ফোন আসে। আমি সেদিন ছুটিতে ছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই একটু বিরক্ত হই, কিন্তু ফোনটা না ধরলে আবার অন্য সমস্যা হতে পারে, তাই ফোনটা ধরলাম”।
অর্ক বলল “ঈশ, একটা সিগারেট দরকার ছিল। অবশ্য আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি। সিগারেট স্মোকিং ইজ ভেরি ব্যাড। আপনি স্মোক করেন নাকি?”
সোম বললেন “না”।
অর্ক অবাক হবার ভাব করে বলল “স্ট্রেঞ্জ! ভেরি স্ট্রেঞ্জ। বাট ইয়েস, আই মাস্ট অ্যাপ্রেসিয়েট ইট। আচ্ছা, ক্যারি অন”।
সোম বললেন “ফোনটা করেছিলেন উপরের এক অফিসার”।
অর্ক বলল “বিপুল কুমার তালুকদার? তাই তো?”
সোম একটু চমকে অর্কর দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক গলায় বললেন “হ্যাঁ”।
অর্ক বলল “তারপর?”
সোম বললেন “আমাকে তখনই ওনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে বললেন। আমি বিরক্ত হলাম কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হেড অফিসে পৌঁছে গেলাম”।
অর্ক বলল “দেন?”
সোম বললেন “স্যার বললেন রত্নাকর আগরওয়ালের কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার সুরেশ্বর রাও কিছুতেই সুবিধা করে উঠতে পারছেন না তো আমি যেন এই কেসের চার্জটা নি”।
অর্ক বলল “সুরেশ্বর রাওয়ের তো ট্রান্সফারও হয়ে গেছিল সেদিনই। তাই না?”
সোম মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, সেদিনই। স্যার ওনাকে নিয়ে একেবারেই অখুশি ছিলেন। সুরেশ্বর নাকি এতদিন ধরে ঘুমোচ্ছিল, কিছুই করছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি ওকে আমার সামনেই যা নয় তাই বলে ঝেড়ে গেলেন। আমি সুরেশ্বর সম্পর্কে যেটুকু জানতাম তাতে বুঝেছিলাম নিশ্চয়ই কোন ইনফ্লুয়েন্স আছে বলেই ও কেসটা নিয়ে ধীরে চলার নীতি নিয়েছিল, এবং সেটা প্রমাণ হতেও বেশি সময় লাগল না। স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে সবে রাওয়ের কাছ থেকে চার্জ বুঝতে বেরিয়েছি ঠিক সেই সময় অর্ণব বোস ফোন করলেন”।
অর্ক বলল “দ্যাট ফেমাস লিডার যে জনসভায় রক স্টারের মত মাথা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেন?”
সোম বললেন “হ্যাঁ। দ্যাট ফেমাস লিডার”।
অর্ক বলল “তো তিনি কী বললেন আপনাকে?”
সোম বললেন “ফোন ধরেই বললেন তিনি আমার কর্ম ক্ষমতার খুব সুখ্যাতি শুনেছেন, তিনি জানেন রত্নাকর আগরওয়াল মার্ডার কেসটা আমার থেকে ভাল কেউ হ্যান্ডেল করতে পারবে না”।
অর্ক বিড়বিড় করে বলল “দ্যাট ফাকিং স্কাউন্ড্রেল। ওহ সরি, ইউ ক্যারি অন”।
সোম দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন “ওরা আসছে বোধ হয়। পায়ের শব্দ পাচ্ছি”।
অর্ক গলাটা একটু জোরে করেই বলতে শুরু করল “তারপর বুঝলেন তো, আমার মানস সরোবর যাবার খুব ইচ্ছা। কৈলাশে গেলেও নাকি খুব পুণ্য হয়। ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা মানস সরোবরে স্নান করার। মাইনাস টেম্পারেচারে খালি গায়ে স্নান, উফ, ভাবতেই গায়ে কেমন কাঁটা দিচ্ছে না বলুন?”
দরজা ঠেলে রাণী ঢুকলেন। পিছন পিছন আঁখি। অর্ক রাণীর দিকে তাকাল “আচ্ছা শীতে স্নান করেন আপনারা? আমি কিন্তু শীত হোক গরম হোক ঠান্ডা জলে স্নান করি”।
রাণী বললেন “এই শীতে?”
অর্ক উঠল “হ্যাঁ এই শীতে। এই তো আজকে আমি ওই ভোরে ঠান্ডা জলে স্নান করে নিয়েছিলাম, আমি তো প্রাণায়মও করি, আপনারাও ট্রাই করতে পারেন দেখবেন?”
রাণী সভয়ে বললেন “রক্ষে কর বাপু, মাঝরাতে এইসব ব্যায়ামের ক্লাস আমি করতে চাই না”।
অর্ক জোরে জোরে হাসতে হাসতে বলল “আচ্ছা, তাহলে আমি আসি, দেখা যাক, দু প্লেট মাংস একটা জেলুসিলে হজম হয় নাকি”।
সোম বললেন “আরেকটা জেলুসিল নিয়ে যাও তাহলে?”
অর্ক বলল “না না, আমি বরং যাই”।
হন হন করে বেরিয়ে চলে গেল অর্ক। আঁখি বলল “বাবা তুমি এতক্ষণ এই পাগলটার সঙ্গে কথা বলছিলে? তোমার কি মাথা খারাপ?”
সোম মুখে হাসিয়ে ফুটিয়ে বললেন “আর বলিস না, সে কত গল্প, ওর নাকি মানস সরোবর যাবার ইচ্ছা, আরও কী কী সব বলে গেল গড়গড় করে”।
আঁখি রাগী রাগী গলায় বলল “ডিসগাস্টিং”!
৮ )
মাঝরাত থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল।
আঁখি ঘুম ভেঙে উঠে বসে ছিল। বাজ পড়ছে জোরে জোরে। রাণী ঘুম চোখে বললেন “কীরে, উঠলি কেন?”
আঁখি বলল “দেখো না কেমন বাজ পড়ছে, আমার ভয় লাগছে খুব”।
রাণী বললেন “ভয় পাবার কী আছে?”
আঁখি বলল “কী জোরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখো”।
রাণী বললেন “আরে পাগলী পাহাড়ে এরকম বৃষ্টিই হয়। ভয় না পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমো”।
আঁখি বলল “পাওয়ার চলে গেছে মনে হচ্ছে?”
রাণী বললেন “রাতে পাওয়ার দিয়ে কী করবি? ঘুমো তো”।
সোমের ঘুম ভেঙে গেছিল। বললেন “কীরে কী হল?”
আঁখি বলল “আমার না খুব ভয় লাগছে, মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হবে”।
সোম বললেন “কিচ্ছু হবে না মা, ঘুমা, বৃষ্টি এভাবেই হয় পাহাড়ে”।
রাণী জোরে করে আঁখিকে শুইয়ে দিলেন। আঁখি গুটিশুটি মেরে মাকে জড়িয়ে শুয়ে থাকল।
রাণী বললেন “পাগলী!”
#
আঁখির ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে।
জানলার কাঁচ ভিজে আছে। আঁখি উঠে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। তার মনে পড়ল হোটেলের ছেলেটা বলেছিল আকাশ পরিষ্কার থাকলে ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যাবে।
সে পা টিপে টিপে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে গেল। ছাদের দরজা খোলাই ছিল।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। অপূর্ব সে রূপ। আঁখির মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে। সে মুগ্ধ হয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকল।
“এখান থেকে কত কিলোমিটার হতে পারে?”
অর্কর কথায় আঁখির ঘোর কাটল। বলল “মানে?”
অর্ক ক্যামেরাতে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলতে তুলতে বলল “কাঞ্চনজঙ্ঘা, এখান থেকে কত কিলোমিটার হতে পারে?”
আঁখি বলল “আমি আপনার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দেব না”।
অর্ক বলল “কেন আমি কী করলাম?”
আঁখি বলল “আপনি সেদিন আমার জন্য হোটেল থেকে চেক আউট করেছিলেন। তাই না?”
অর্ক বলল “না না, ব্যাপারটা আসলে তা নয়, আপনি ভুল বুঝছেন”।
আঁখি বলল “কী ভুল বুঝছি? যা বোঝার ঠিকই বুঝছি। আমি সেদিন একটু বেশি রুড বিহেভ করে ফেলেছিলাম। আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট”।
অর্ক বলল “এই মরেছে, আপনি আবার সরি বলছেন কেন? আমাকে আবার কেউ সরি বলে নাকি? আমি কত ছোট আপনার থেকে!”
আঁখি হেসে ফেলল “আপনি ছোট?”
অর্ক জিভ কাটল “ঈশ, না না সরি সরি, এটা ফ্লোতে বেরিয়ে গেল। মানে সবাই আমার থেকে বড় তো, এই আপনাকেই পেলাম যে আমার থেকে ছোট। এটা খুব ভাল হল। মানে আই অ্যাম হাইলি হ্যাপি”।
আঁখি বলল “হাইলি হ্যাপিটা কী জিনিস?”
অর্ক বলল “অনেকদিন পর খুব ভাল একটা ফুচকা খেলে যে ফিলিংটা হয়, কিংবা ধরুন আপনি রান্না জানেন না, কিন্তু রান্না করার পর অ্যাক্সিডেন্টলি দেখলেন যে জিনিসটা বানিয়েছেন, সেটার টেস্ট হেভেনলি হয়েছে। তখন যে ফিলটা হয় তাকে হাইলি হ্যাপি বলা হয়”।
আঁখি বলল “ওহ, আচ্ছা। বুঝলাম”।
অর্ক বলল “কী বুঝলেন? জানেন কাল রাতে আমি ঘুমোতেই পারি নি, শুধু মনে হচ্ছিল বৃষ্টিতে বোধ হয় হোটেল শুদ্ধ ভেঙে পড়বে। অনেক দিন পর এরকম ভয় পেলাম আমি। এর আগে শেষ ভয় পেয়েছিলাম মাধ্যমিকের ইতিহাস পরীক্ষার আগে। তারপর বহুদিন পরে এরকম একটা জম্পেশ ভয় পেলাম”।
আঁখি বলল “ওহ, আপনি ভয় পেয়েছেন? ভয় পাওয়ার মত কী হল?”
অর্ক বলল “ভয় পাব না? কী যে বলেন? তবে আপনাকে দেখলেই মনে হয় আপনি ভীষণ সাহসী। সেরকম লেভেলের একটা বন্দুক পেলে বাঘ টাঘ মারা আপনার কাছে নস্যি। প্লে অফ লেফট হ্যান্ড”।
আঁখি বলল “প্লে অফ লেফট হ্যান্ড মানে?”
অর্ক বলল “বা হাতের খেল। আমি আবার ভীষণ ভীতু জানেন?”
আঁখি বলল “আপনি কিসে ভয় পান?”
অর্ক বলল “সব কিছুতেই। সব থেকে ভয় পাই পাহাড়ে ভূমিকম্পকে। তারপরে ভয় পাই নাগরদোলাকে, তারপরে ভয় পাই কেউ যদি আমার উপর খুব রেগে যায় তাকে। এই যেমন আপনি”।
আঁখি বলল “রাগ করার ভ্যালিড কারণ ছিল। এমনি এমনি কেউ রাগ করে না। আপনাকে আমি চিনি না জানি না আর আপনি বলে দিলেন টব হাতে ফটো তুলতে? মানে সিরিয়াসলি? আপনার মাথায় এলো কী করে একটা মেয়ে অত বড় একটা টব হাতে ফটো তুলবে? ছবিটা কখনও মাথায় এসছে আপনার?”
অর্ক কয়েক সেকেন্ড মাথা চুলকে বলল “ছবিটা? বলছেন? আচ্ছা আপনি আমার এই ক্যামেরাটা ধরুন তো!”
অর্ক ক্যামেরাটা আঁখির হাতে দিল। তারপর একটা টব তুলে সব কটা দাঁত বের করে বলল “নিন এবার একটা ফটো তুলুন তো। দেখি কেমন দেখতে লাগে”।
আঁখি জোরে হেসে উঠল, বলল “আপনি নিজেকে দিয়ে আমার ছবিটা কল্পনা করবেন?”
অর্ক বলল “হ্যাঁ কারণ আপনি তো আর টব ধরে দাঁড়াবেন না”।
আঁখি বলল “আপনাকে কেউ বলে নি আপনার মাথায় দু চারটে স্ক্রু ঢিলা আছে?”
অর্ক বলল “বলেছে তো। সবাই আসলে আমাকে হিংসা করে। আমি একটা এক্সট্রা অরডিনারি ট্যালেন্ট তো তাই”।
আঁখি বলল “হ্যাঁ, সত্যিই আপনি এক্সট্রা অরডিনারি ট্যালেন্টই বটে। এক কোটিতে একটা, আপনি স্পেশাল এডিশন, আনডাউটেডলি”।
অর্ক বলল “এই তো, আপনি তো খুব ভাল। কত ভাল আমাকে চিনতে পেরেছেন”।
আঁখি বলল “আপনাকে চিনতে কিছুই লাগে না। আপনি সাদা পাতার মত স্বচ্ছ”।
অর্ক বলল “একদম। আচ্ছা এসব বাদ দিন। দেখুন না আপনার বাবাকে বলে আজ যদি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যায়”।
আঁখি বলল “কোথায় যাবেন?”
অর্ক বলল “কাঞ্চনজঙ্ঘা। কত আর দূর হবে? এখান থেকে যখন দেখাই যাচ্ছে তখন খুব বেশি হলে দশ বারো কিলোমিটার? কী বলেন?”
আঁখি মাথায় হাত দিয়ে বলল “উফ! কার পাল্লায় পড়লাম আমি!”

আঁখি যখন ঘরে ঢুকল তখন রাণী ঘুমাচ্ছিলেন। সোম উঠে বসেছিলেন।
আঁখি বলল “ঈশ, কী মিস যে করলে তোমরা! কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছিল। এখন আবার ঢেকে গেল”।
আঁখির গলা কাঁদো কাঁদো শোনাল।
সোম হাসলেন “চিন্তা করিস না মা, আবার দেখা যাবে। পালিয়ে যাবে কোথায়?”
আঁখি বলল “কে জানে, যা বৃষ্টি হচ্ছে কদিন ধরে। আচ্ছা বাবা, মা এখনও ঘুমাচ্ছে কেন বলতো? সাতটা বাজতে চলল। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণ যে কী করে বেড়াত!”
সোম বললেন, “থাক থাক। ঘুমাতে দে। যা ঝড় যায় কলকাতা থাকলে, কদিন বিশ্রাম করে নিক। তুই কি ছাদে একা ছিলি?”
আঁখি বলল “না না, ওই পাগলটাও ছিল”।
সোম বললেন “তাই ভাবি, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেল অথচ তুই তো আমাদের ডাকতে এলি না”!
আঁখি ঈষৎ লাল হল “ধ্যাত, কী যে বল না। আমি তো পাগলটার পাগলামি দেখছিলাম”।
সোম বললেন “তাই? তা কী কী পাগলামি দেখলি?”
আঁখি হাসতে হাসতে বলল “বলে কী না তোমাকে একটা গাড়ি ঠিক করতে বলবে। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা নাকি বেশি দূরে না, মাত্র দশ পনেরো কিলোমিটার”।
আঁখির হাসির শব্দে রাণীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন “কী রে এত হাসি কীসের?”
আঁখি বলল “তুমি আজ বিশাল মিস করে গেছ মা, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছিল”।
রাণী বললেন “ডাকলি না কেন?”
আঁখি আবার লাল হল, বলল “তোমরা ঘুমোচ্ছিলে, ভাবলাম যদি ডিস্টার্বড হও”।
রাণী কয়েক সেকেন্ড আঁখির দিকে তাকিয়ে বললেন “ডিস্টার্বড হব কেন খামোখা? কী যে বলিস না? একা একা ছাদে ছিলি?”
আঁখি বাবার দিকে তাকিয়ে বলল “উফ, সবাই একই প্রশ্ন করে যায় শুধু”।
সোম বললেন “না অর্ক ছিল তো ছাদে”।
রাণী হাসতে শুরু করলেন “ওহ, বুঝেছি বুঝেছি”।
আঁখি রেগেমেগে একটা কম্বলের তলায় ঢুকে গেল।
রাণী বললেন “আমাদের মেয়েটাও তো কম পাগল না, সেটা তো আমার থেকে ভাল কেউ জানে না, জানো কাল সারারাত আমাকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল। এখনও বাজ পড়লে ভয় পায়, বোঝ!”
সোম বললেন “স্বাভাবিক। শহরে মানুষ হলে বাজে একটু ভয় পাবেই। তবে পাহাড়ের বৃষ্টি ভয় পাবার মতই। এক একটা রাস্তা ধ্বস নেমে বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে অশেষ দুর্ভোগ। পাহাড়ের কষ্ট পাহাড়ী লোকেরাই বোঝে। আমরা শহর থেকে সাত আটদিন থেকে চলে যাই। যারা থাকে তারাই জানে”।
রাণী বললেন “রুমকিরাই তো গত বছর, ভুলে গেলে? সিকিমে এসে আটকে গেছিল? জিনিসপত্রের সব দ্বিগুণ তিনগুণ করে দাম নিচ্ছে, বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। বৃষ্টি হলে আমার সেসব ভয়ই লাগে”।
আঁখি বলল “আর আমার মনে হয় হোটেলটা বোধ হয় গুড়িয়েই গেল। দেখ না কেমন খাদের ওপর হোটেল, আমার খুব ভয় লাগে”।
সোম বললেন “অত ভয় পেলে হয় না। বাড়িতে থাকলেও ভূমিকম্প হতে পারে মা। মনে নেই গত বছর? আমি তখন অফিসে, তুই ফোন করে কী চ্যাঁচামেচি শুরু করেছিলি? সব কিছুতে এত ভয় পাস কেন?”
আঁখি বলল “ভয় পাবার ব্যাপারে ভয় তো পেতেই হবে...”
আঁখির কথা শেষ হল না কলিং বেল বেজে উঠল। সোম একটু গলা তুলে বললেন “খোলা আছে”।
দরজাটা খুলল। অর্ক। বলল “একটু পেস্ট হবে আপনাদের কাছে? আমারটা কাল থেকে পাচ্ছি না। ব্যাগের কোন কোণায় ঢুকিয়ে ছিলাম চেক আউটের সময় ভুলে গেছি। সারা দিন কাল শুধু ব্রাশ আর জল দিয়ে কাজ চালিয়েছি। আজ আর হবে না”।
রাণী হাসলেন “বেসিনেই আছে, নিয়ে নাও”।
অর্ক “থ্যাঙ্কস” বলে বেসিন থেকে পেস্ট নিয়ে ব্রাশে লাগিয়ে মন দিয়ে দাঁত মাজতে লাগল। মুখ টুখ দিয়ে বলল “উফ, বাঁচালেন, পেস্টের অপর নাম জীবন, আজ বুঝতে পারলাম। নইলে কেউ আর কথা বলত না আমার সঙ্গে”।
সোম বললেন “আজ কি কোথাও যাবে না হোটেলেই কাটাবার প্ল্যান আছে?”
অর্ক বলল “আজ একটা কাজ করলে হয় না? আমি ভাবছিলাম পেলিং চলে গেলে কেমন হয়? উত্তরেতে একটা দারুণ হোম স্টে আছে”।
সোম কয়েক সেকেন্ড অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন “এত দূরে যেতে যেতে যদি কোথাও ধ্বস নামে তাহলে ফিরবে কী করে?”
অর্ক বলল “তাহলে তো ভালই হয়। ফিরতে কে চায়। ফিরলেই তো সেই থোড় বড়ি খাড়া, আর খাড়া বড়ি থোড়। ওই অফিস কি ভাল লাগে বলুন? আপনিই বলুন, আপনার অফিস ভাল লাগে?”
সোম বললেন “নাহ। সত্যিই ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিলেই ভাল হত”।
অর্ক বলল “তবে? তবেই বুঝুন? দেখুন কী করবেন বলুন, তাহলে উত্তরে যাওয়া যেতে পারে”।
সোম আঁখির দিকে তাকালেন “কী রে মা, যাবি?”
আঁখি বলল “চল। এ জায়গাটা একটু এক ঘেয়ে লাগছে এখন”।
রাণী বললেন “চল তো! ঘুরেই আসি”।
সোম বললেন “ওকে, আপনি, ইয়ে সরি তুমি তাহলে দেখো গাড়ি জোগাড় করতে পারো নাকি। আজ উত্তরেই যাওয়া যাক তবে”।
অর্ক বলল “দেখছি দেখছি, গাড়ি নিয়ে সমস্যা হবার কথা নয়”।
বলতে বলতে অর্ক বেরিয়ে গেল।
রাণী বললেন “দেখি, ছোকরা কোথায় নিয়ে যায়। কী বলিস মা?”
আঁখি কম্বলের তলা থেকে বলল “হু”।

 

(বাকিটা পড়তে বই/পিডিএফ কিনতে হবে)