Menu

অভীক অর্জুন দত্ত

আদার মেসেজবক্স/অভীক দত্ত 

১।

অহনা বাড়ি যখন ফিরল তখন রাত এগারোটা। ড্রয়িং রুমে বাবা গম্ভীর মুখে পায়চারি করছে। মা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।

অহনা বুঝল আজ আবার বৃহত্তর নৃত্যনাট্য অপেক্ষা করে আছে তার জন্য। বাবা হাত পা তুলে নেত্য করবে আর মা কাঁদো কাঁদো মুখে বলবে “বাড়িতে রোজ রোজ ঝামেলা আমার আর ভাল্লাগে না মা। দেখ না যদি কোনভাবে বাবা যেটা বলছে মানে, বিয়ে, সেটলমেন্ট”।

অহনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসল। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল “নাও, শুরু করে দাও”।

বাবা, মার দিকে তাকিয়ে বলল “দেখলে? দেখলে? আমি আর কিছু বলব না। যা ইচ্ছা তাই হোক এই বাড়িতে”।

গটগট করে বাবা চলে গেল বেডরুমে।

মা তার দিকে কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাবার পিছন পিছন চলে গেল।

অহনা সেদিকে তাকিয়ে উঠল। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাল। তারপর ডাইনিং টেবিলে গিয়ে ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে নিল।

অহনা বুঝল মা প্রচুর রাগ করেছে।

অন্যান্য দিন অন্তত খাবার সময়ে থেকে রাজ্যের সেন্টুগুলো দেয়।

ঘরে ঢুকে অহনা দরজা বন্ধ করল। বলা যায় না, মাঝরাতে যদি হঠাৎ মার ব্যথা জেগে ওঠে তো তবে কেলেঙ্কারি।

আপাতত দুদিন কোন কাজ নেই। অহনা ঠিক করেছে বাড়িতে বলবে না। বললেই মা একগাদা সম্বন্ধ আনা শুরু করবে।

মাঝে মাঝে অহনা ভাবে তার বিয়ে হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে? নাকি সে মডেলিং করে, সেটাতে সরাসরি আপত্তি দেখালে আধুনিক বাবা মার তকমা চলে যাবে বলে ঘুর পথে বিয়ে দিয়ে সেটাকে বন্ধ করতে চায় তারা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। কত দিন আর এই লড়াই চালাবে একা একা? একদিন হার মানতেই হবে তাকে।

ল্যাপটপ অন করল সে। ভিকির শুটের কিছু ফটো পাঠানোর কথা আছে। সেগুলো দেখে তারপরেই ঘুমাবে। টায়ার্ড লাগছে খুব।

ল্যাপটপ অন হতে হতে মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ খুলল সে।

“ওরে গ্রেট নিউজ আছে। সিরিয়াল কুইন বীণাদি ফোন করেছিল একটু আগে। ওনার আপকামিং সিরিয়াল “কুসুমকুঞ্জ”র জন্য বীণাদির তোকে খুব পছন্দ।এটা কিন্তু মারাত্মক খবর। কালকের মধ্যে জানাস”।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল অহনা। টিভি সিরিয়াল! শুধু ফটোশ্যুট আর ফ্যাশন শোতেই তার এই অবস্থা, সিরিয়াল হলে আর দেখতে হবে না। এর আগেও সাইড রোলের অফার এসছিল। মাকে বলতেই আঁতকে উঠেছিল “তোর বাবা যদি জানে”!

টানা আঠেরো উনিশ ঘন্টা শ্যুট হয় ভাবতেই বাবার মুখটা মনে পড়ে গেল।

 “হবে না রনিদা, ছেড়ে দাও”... খানিকটা টাইপ করে আর সেন্ড করল না অহনা।  একটা রাত দেখা যাক। সকালে ঠিক করে নেবে।

বীণাদিকে সরাসরি না বলে দেওয়াটাও ঠিক হবে না। খুব স্ট্রাগল করে উঠেছেন ভদ্রমহিলা। মেয়েদের স্ট্রাগলকে নিজেও খুব সাপোর্ট করেন। রনিদাকে দিয়ে বলালে আঘাত পাবেন।

বীণাদি সম্প্রতি একটা বুটিক খুলেছেন। অহনা ঠিক করল বীণাদির বুটিকেই একদিন গিয়ে সমস্যাটা খুলে বলবে। ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই বুঝবেন।

অহনা ফেসবুক খুলল। তার ফ্রেন্ডলিস্ট খুব সীমিত। চেনা পরিচিতর বাইরে কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখে না সে।

একগাদা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসছে। ফেসবুকে মেয়ে দেখলেই পঙ্গপালের মত ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে শুরু করে ছেলেরা। অহনা সেগুলো কাটতে শুরু করল।

হঠাৎ মাউসপ্যাডটা স্লিপ করে যাওয়ায় কার্সরটা মেসেজে চলে গেল। আদার মেসেজ ফোল্ডারে একটা ছেলে, নাম নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত, লিখেছে “হ্যালো, আই হ্যাভ সাম সিরিয়াস জব উইথ ইউ। প্লিজ রিপ্লাই, ইটস আর্জেন্ট” মেসেজ করেছে।

অহনা অন্যান্য দিন মেসেজ খোলে না। ছেলেটার মেসেজটা দেখে কৌতূহলবশত মেসেজটা খুলল।

মেসেজ রিকোয়েস্টটা অ্যাক্সেপ্ট করল সে।

লিখল “ইয়েস”।

ছেলেটা অনলাইনই ছিল, তার মেসেজ দেখার সাথে সাথে লিখল “একটু কথা বলা যাবে?”

অহনা অন্যান্য দিন এসব কেস পাত্তা দিত না। মাথাটা পুরোটাই এলোমেলো লাগছিল তার। ভাবল দেখাই যাক এই ধরণের মেসেজ কী কথা বলে।

লিখল “হ্যাঁ। বলুন”।

ছেলেটা লিখল “আমি একজন অ্যামেচার ফটোগ্রাফার। কিন্তু আমি কাউকেই পাচ্ছি না ফটো তোলার মত। আপনি কি আমার মডেল হবেন?”

অহনা চমৎকৃত হল। বাহ। একজন অ্যামেচার ফটোগ্রাফার তার ছবি তুলতে চাইছে? সেই অহনা সেনগুপ্তর যে কিনা একবার ফেম ফিমেল ফেস অফ কলকাতা, একবার আনন্দ নিকেতন পত্রিকার মিস কলকাতা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে? কোনো না কোনো ম্যাগে কভার পেজে যার ছবি থাকে?

হেসে ফেলল সে। শুধু লিখল “সরি”। তারপর ফেসবুক বন্ধ করে মেইল চেক করা শুরু করল। তার আর পারমিতার শুট ছিল আজ। পারমিতার দিকে আজকাল একটু বেশিই ঝুঁকছে সবাই। এক্কেবারে নতুন এসেছে। স্কিনটা বেশ ভাল।

অহনার হিংসে হয় না। কিন্তু মেয়েটার কিছু একটা আছে যেটা তার ভাল লাগে না। হতে পারে মেয়েটার স্বাধীনতাকে সে হিংসা করে।

ভিকির তিনটে ফটো দেখার পরে অহনা সেগুলোও বন্ধ করে দিল। পারমিতাকে তার থেকে ঢের ঢের বেশি সুন্দরী লাগছে ফটোগুলোতে।

ল্যাপটপ বন্ধ করল অহনা। টায়ার্ড লাগছিল।

লাইট অফ করে চোখ বুজল।

পনেরো মিনিট কেটে যাবার পরে বুঝল ঘুম আসবে না। প্রায়ই হচ্ছে এরকম আজকাল। টায়ার্ড লাগছে কিন্তু ঘুমের সময় ঘুম আসছে না।

ফোন অন করে ফেসবুক খুলল সে। ছেলেটা রিপ্লাই কী করেছে দেখল।লিখেছে “প্লিজ, বিলিভ মি, আমি কাজটায় আপনাকে প্রফেশনালি এনগেজ করতে চাই। আই উইল পে ইউ ফর দ্যাট”।

অহনার মাথা গরম হল, লিখল “টাকার গরম দেখাবেন না”।

ছেলেটা সাথে সাথে রিপ্লাই করল “বিশ্বাস করুন, টাকার গরম দেখাচ্ছি না। কিন্তু আমার এই মুহূর্তে আপনি ছাড়া আর কারও কথা মনে হয় নি বলেই আপনাকে মেসেজ করেছি”।

অহনার মাথা কাজ করছিল না। এরকম প্রস্তাব সে আগে এরকম পায় নি তা না, তবে প্রতিবারই কাটিয়ে গেছে।

 ছেলেটার মেসেজ দেখে তার এবার ইচ্ছা হল মজা করতে। টাকার কথা বলল, দেখা যাক কতদূর যেতে পারে। সে লিখল “কত টাকা লাগে আপনার কোন আইডিয়া আছে?”

রিপ্লাই এল “আউটডোর শ্যুটে যাব। আপনি যে টাকা চাইবেন আমি সেই টাকা দিতে রাজি”।

অহনার হাসি পেল, লিখল “এক লাখ টাকা দেবেন?”

রিপ্লাই এল “ডান”।

অহনা সতর্ক হল। ছেলেটার উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয় তো? সে কিছু লিখল না।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল ছেলেটা সেটাই লিখল “আপনি কি ভাবছেন আমার কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে? প্লিজ সেসব ভাববেন না। ফটোগ্রাফি ছাড়া আমার আর কোন উদ্দেশ্য নেই বিশ্বাস করুন”।

অহনা একটু চুপ থাকল। ছেলেটার প্রোফাইল এতক্ষণ খোলে নি সে। এবারে খুলল।

প্রোফাইলটায় সত্যিই কিছু ভাল ছবি আছে। ছেলেটা ভাল ফটোগ্রাফার।

তার হঠাৎ ইচ্ছা হল অচেনা অজানা এই ছেলেটার সাথে পরিচয় করতে। কেন হল কে জানে, কিন্তু মাথাটা তার এতটাই ঘেঁটে ছিল যে এই সমস্ত কিছু থেকে পালাতে তার হঠাৎ করেই ছেলেটার সাথে দেখা করার ইচ্ছা হল।

লিখল “কাল সকালে আটটায় চিংড়িহাঁটা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকব। ওখান থেকেই পিক আপ করবেন”।

ছেলেটা মিনিট দুয়েক টাইপ করল না দেখে অহনা লিখল “হ্যালো, আর ইউ দেয়ার?”

ছেলেটা শুধু লিখল “ডট আটটা। ডান”।

অহনা ফোনটা বন্ধ করে হাসল। কাল ছুটির দিনটা অচেনা কারও সাথে দেখা হবে। বাড়িতে বাবা মার সাথে কাটানোর থেকে অনেক ভাল।

২।

বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হল। অহনা কোনমতে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গাড়িটা নিল না সে। বাড়ি থেকে খানিকটা হাঁটলেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পড়ে। সেখান থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চিংড়িহাটায় নেমে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখল একটা এনফিল্ড বাইকে বসে তার জন্য ছেলেটা অপেক্ষা করছে।

সে ট্যাক্সি থেকে নামতেই ছেলেটা হাসল। বাস স্ট্যান্ডে দু চারজন ছিল। এক মহিলা তাকে চিনতে পেরেছিল হয়ত। তার দিকে ঠায় তাকিয়েছিল। অহনা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ছেলেটাকে বলল “বলুন, কোথায় যাবেন?”

ছেলেটা একটা হেলমেট তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল “নিন, এটা পরে নিন। নইলে কলকাতার রাস্তা আর পেরোতে হবে না তার আগেই কেস খাব”।

অহনা অবাক হয়ে বলল “কলকাতা পেরোবেন? কোথায় যাবেন?”

ছেলেটা বলল “পরে বসুন। ওই মহিলা আপনাকে যেভাবে দেখছে পারলে এখানেই একটা চিৎকার জুড়ে দেবেন। আপনি বেশ পরিচিত মুখ, ভুলে যাচ্ছেন কেন?”

অহনা হেলমেট পরে ছেলেটার পিছনে একটু দূরত্ব রেখে বসল। ছেলেটা কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।

সকাল সকাল বেশ শীত শীত লাগছিল বাইকের পিছনে বসে। কিন্তু মজাও লাগছিল তার। মাস খানেক রোবটের মত মুখ করে কাজ করতে করতে ক’দিন ধরেই মনে হচ্ছিল সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়। আজ মনে হচ্ছিল সত্যিই সে সব কিছুর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।

বেশ খানিকটা সময় পরে অহনা আবিষ্কার করল গঙ্গার কাছে একটা চমৎকার লোকেশনে তারা এসে পৌঁছেছে। গঙ্গার তীরে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা বাড়ি, ঝকঝকে একটা বাগান। গেট খুলে দিল একটা লোক। বাইকটা থামার পরে তারা নামল। ছেলেটা বলল “আসুন”।

অহনা অবাক হল “এটা আপনার বাড়ি?” কথাটা বলেই তার মনে পড়ল ছেলেটার নাম নীলাঞ্জন।

তার প্রশ্নের উত্তরে ছেলেটা হাসল, “হ্যাঁ”।

অহনা বলল “একা থাকেন?”

নীলাঞ্জন বলল “আমি আর ওই বীরেনদা ছাড়া কেউ থাকে না”।

অহনা বুঝল যে লোকটা দরজাটা খুলেছিলেন তিনিই বীরেনদা।

নীলাঞ্জন বলল “প্লিজ কমফর্টেবল হোন। আপনি নিশ্চয়ই ব্রেকফাস্ট করেন নি?”

অহনার মনে পড়ে গেল সে কিছু খেয়ে আসে নি। বাগানের ঘাসের ওপরে টেবল চেয়ার পাতা ছিল। নীলাঞ্জন অহনাকে বলল “আপনি একটু বসুন। আমি আসছি”।

অহনা কিছু বলল না। তার পুরোটাই মজা লাগছিল খুব। ইনবক্সের আদারস ফোল্ডার থেকে যে ব্যাপারটা এতদূরে চলে আসবে সে ভাবতেই পারছিল না।

একগাদা লুচি নিয়ে হাজির হল বীরেনদা। অহনা চমকে উঠল। এই লুচি খেলে আর দেখতে হবে না। এত ক্যালোরি!

তারপরেই তার মনে হল সকাল থেকে তো নিয়ম ভাঙাই চলছে। এটা হলে আর সমস্যা কী?

মনের সুখে লুচি খাওয়া শুরু করল অহনা।

কতদিন পরে লুচি খাচ্ছে সে? তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে এল।

“আপনার খাওয়া হয়ে গেলে একটু ওয়ার্ডরোবটা দেখবেন প্লিজ”।

সম্বিত ফিরল নীলাঞ্জনের কথায়। কখন চলে এল কে জানে। অহনা একটু লজ্জা পেল। চোখ বুজে লুচি খাচ্ছিল দেখে ফেলল নাকি?

অহনা বলল “ওয়ার্ডরোব? মানে?”

নীলাঞ্জন বসল “একটা ভুল হয়ে গেছে। আমার মাথাতেই আসে নি। আচ্ছা আপনি শাড়ি পরতে পারেন তো? মানে আপনাকে শাড়ি পরা অবস্থায় ফটোতে দেখেছি ঠিকই কিন্তু খেয়াল করিনি ওটা আপনি পরেছিলেন নাকি কেউ পরিয়ে দিয়েছিল”।

অহনা অবাক হল, সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। বলল “হ্যাঁ পারি”।

নীলাঞ্জন বলল “বাঁচালেন। আসলে আমার থিমটাই সাবেকিয়ানা। ওয়ার্ডরোবে দু রকম শাড়ি রাখা আছে। যেরকম পছন্দ হয় পরতে পারেন। ওখানেই দেখবেন গয়নার বাক্স আছে। সব ক’টা গয়না পরবেন পারলে”।

অহনার খাওয়া হয়ে গেছিল। বলল “আচ্ছা”।

নীলাঞ্জন ডাকল “বীরেন দা”।

ভদ্রলোক কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। নীলাঞ্জন বীরেনদাকে নির্দেশ দিল অহনাকে বেসিন দেখিয়ে দেওয়ার। তারপরে ঘরটা চিনিয়ে দিতে বলল। বীরেনদা বাড়ির ভিতরে এনে একটা ঘর দেখিয়ে দিল তাকে।

অহনা বাড়িটা দেখে বেশ অবাক হল। কলকাতার এত কাছে এতটা জমি নিয়ে এত বনেদী একটা বাড়ি, শুটিং পাব্লিকরা জানে না এখনও, জানলে মারামারি পড়ে যেত।

ঘরে ঢুকে ওয়ার্ডরোবের শাড়ি দেখল সে। তাঁতের শাড়ির সাথে ডিজাইনার শাড়িও দেখল। অহনা তাঁতই পছন্দ করল। এই পরিবেশে তাঁত ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছিল না সে।

আয়নার সামনে গয়নার বাক্স রাখা। অহনা বাক্সটা খুলল। এবং খুলেই তার চক্ষু চড়কগাছ হল। পুরনো দিনের ডিজাইনের খাঁটি সোনার গয়না। সোনার হার, কানপাশা, চূড়, কঙ্কন, পুস্পহার আরও অনেক কিছু যার সে নামও ঠিক করে জানে না।

 অহনা ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। নীলাঞ্জন ক্যামেরায় বাগানের ফুলের ছবি তুলছিল, তাকে বেরোতে দেখে বলল “কী হল, এনি প্রবলেম?”

অহনা বলল “গয়না তো সোনার!”

নীলাঞ্জন বলল “হ্যাঁ। সমস্যা কী?”

অহনা বলল “বাড়ির সোনার গয়না দিয়ে শ্যুট করবেন? আমি যদি চুরি করে নি?”

নীলাঞ্জন হাসল “করলে করবেন। কেউ না কেউ তো পরবে। মার গয়না ছিল”। তারপরেই কেজো গলায় তাড়া দিল “প্লিজ দেরী করবেন না, নইলে অনেক দেরী হয়ে যাবে কিন্তু”।

অহনা বিড়বিড় করল “আমার কী! যা ইচ্ছা তাই করুক”।

তারপর বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল। আধঘন্টা বাদে শাড়ি আর গয়না পরা শেষ হলে আয়নায় নিজেকেই নিজে চিনতে পারছিল না সে। মনে হচ্ছিল তার মত দেখতে আরেকজন কেউ আয়না থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সে ধীর পায়ে বাগানে এলে নীলাঞ্জন তাকে দেখে অস্ফূটে বলল “আমি জানতাম আপনি তাঁতই পছন্দ করবেন”।

অহনা বলল “কিছু বললেন?”

নীলাঞ্জন বলল “না না। আচ্ছা চলুন, আমরা এবার একটু শুরু করি। চলুন গঙ্গাপার থেকেই শুরু করা যাক”।

নীলাঞ্জনের ক্যামেরা কাজ করা শুরু করল।

৩।

নীলাঞ্জন যখন বলল “হ্যাঁ। এবার বলতে পারি আমি স্যাটিসফায়েড”, তখন দেখতে দেখতে দেড় ঘন্টা কেটে গেছে। অহনার পা টনটন করছিল। সে বাগানের ঘাসেই বসে পড়ল।

নীলাঞ্জন হা হা করে উঠল “আরে ঘাসেই বসে পড়লেন যে!”  

অহনা জিভ কাটল “ঈশ, আপনার শাড়ি, সরি সরি”।

নীলাঞ্জন হেসে ফেলল “না না, শাড়ি নিয়ে চাপ নেবেন না। শাড়ির জন্য না, আপনার জন্যই কেনা ও। আপনি ঘাসে বসেছেন বলেই বললাম”।

অহনা বলল “ঘাসেই ভাল লাগছে। দেড় দু হাজার ফটো তুললেন মনে হয় এতক্ষণে। কী করবেন কে জানে! আচ্ছা এটা কি কৃত্রিম ঘাস?”

নীলাঞ্জন বলল “হ্যাঁ। মালি আছে আলাদা বাগানের জন্য। বীরেনদা এসব পারে না”।

অহনা বলল “আচ্ছা একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করি?”

নীলাঞ্জন হাসল “শিওর”।

অহনা বলল “আপনার বাবা মা বউ কেউ নেই?”

নীলাঞ্জন বলল “মা ছোটবেলাতেই চলে গেছিলেন। বাবা গত বছর মারা গেছেন। তারপর থেকেই আমার মাথায় ফটোগ্রাফির ভূত চেপেছে”।

অহনা বলল “আপনার কাজ আমি কালকে ফেসবুকে দেখলাম কয়েকটা। সবই নেচারের ওপরে।বেশ ভাল।  সত্যিই কোন মডেলকে নিয়ে কাজ করেন নি। অবাক হলাম”।

নীলাঞ্জন বলল “আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম কাজ করলে আপনার সাথেই করব নইলে নয়”।

অহনা অবাক হল “কেন বলুন তো? আমার মধ্যে কী এমন আছে?”

নীলাঞ্জন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার ঘাসের ওপরেই বসে পড়ল। বলল “মাটন খাবেন তো দুপুরে? বীরেনদার হাতের মাটন কিন্তু অসামান্য। একদিন না হয় স্যালাড ইত্যাদি না খেলেন!”

অহনা বিরক্ত হল “আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আমি পেলাম না”।

নীলাঞ্জন বলল “আগে লাঞ্চ করে নিন। তারপর না হয় শুনবেন। চলুন”।

তারা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। অহনা আগে সব গয়না খুলে গয়নার বাক্সে রাখল। চেঞ্জ করে নিল।

ডাইনিং রুমে ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, মাংস ইত্যাদি সব সাজানো ছিল। বেসিনে হাত ধুয়ে তারা বসলে বীরেনদা সার্ভ করা শুরু করল।

অনেকদিন পরে অহনা তৃপ্তি করে খেল।  নীলাঞ্জন বলল “বীরেনদার হাতটা সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখা উচিত কি বলেন?”

অহনা বলল “একদম। একদিনেই আমি মনে হয় দু কেজি ওয়েট গেইন করে ফেললাম”।

বীরেনদা পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থাকল।

অহনা খেয়ে নিল। হাত মুখ ধুয়ে বাইরে গিয়ে বসল সে। নীলাঞ্জন বলল “বলুন, আপনাকে চেকে পেমেন্ট করলে অসুবিধা আছে?”

অহনা বলল “ফটোগুলো নিয়ে কী করবেন?”

নীলাঞ্জন হাসল “দেখি ভাল কোন কাজ পাই নাকি”।

অহনা বলল “আমার বারবার মনে হচ্ছে আপনি কিছু লুকোচ্ছেন আমার থেকে। মডেলদের ফটোগ্রাফির কাজ না পেয়ে আপনি না খেতে পেয়ে আছেন, আপনি ঠিক সেই গোত্রের নন। আমার কি ঠিক মনে হচ্ছে?”

নীলাঞ্জন আবার বলল “আপনাকে চেকে পেমেন্ট করলে অসুবিধা আছে?”

অহনা বলল  “আপনি কিন্তু আবার কথা ঘোরাচ্ছেন”।

নীলাঞ্জন বলল “শুনতেই হবে?”

অহনা জেদি হল “আপনাকে বলতেই হবে”।

নীলাঞ্জন হাসল “আচ্ছা। আপনাকে একটা গল্প বলি শুনুন। দু সপ্তাহ আগের কথা। গোল্ড গার্ডেনের একটা সেলস মিট ছিল পার্ক প্রিমিয়ামে মনে আছে?”

অহনা সোজা হয়ে বসল “হ্যাঁ। ফ্যাশন শো ছিল তো একটা। শো স্টপার ছিলাম”।

নীলাঞ্জন বলল “একজ্যাক্টলি। ওখানে আমিও ছিলাম। ছদ্মবেশে। ওখানেই আপনাকে দেখি, এবং তখনই আমার মনে হয় যতই আপনাকে ওয়েস্টার্ন পরিয়ে রাখুক, ট্রাডিশনালে আপনিই সেরা। ওখান থেকে বেরিয়ে বীণা মাসীকে আমি সেটাই বলি”...

অহনা হাত তুলল “এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড। প্লিজ। আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। ছদ্মবেশে, বীণাদি... প্লিজ এক্সপ্লেইন, প্লিজ”।

নীলাঞ্জন বলল “গোল্ড গার্ডেন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আমরা নজর রাখছিলাম। ওই সেলস মিটের পরের দিনই ওখানে একটা ইনকাম ট্যাক্স রেইড হয় সেটা কি আপনি জানেন?”

অহনা হাঁ হয়ে নীলাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থাকল “কী সর্বনাশ! আপনি ইনকাম ট্যাক্স অফিসার?”

নীলাঞ্জন হাসল “ওই আর কী! কিন্তু বিশ্বাস করুন, ওইসব আর ভাল লাগছে না। সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে আমি ফটোগ্রাফিই করব ঠিক করেছি। রোজ আপনাকে ভাবতাম মেসেজ করব, করতে পারি নি, কালকে কী মনে হল মেসেজ করে বসলাম। জুকুবাবু নোটিও দিয়ে দিয়েছিলেন মেসেজ আদারস ফোল্ডারে যাবে আপনার, তবু চান্সটা নিলাম। কপাল ভাল বলতে হবে আপনি দেখতে পেয়েছিলেন”।

অহনা বলল “আর বীণাদি?”

নীলাঞ্জন বলল “আমার নিজের মাসী”।

অহনা মাথায় হাত দিল।

নীলাঞ্জন বলল “আপনার পেমেন্টটা কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হিসেবে দেব না, আপনার পাওনা হিসেবেই দেব, চিন্তা করবেন না।”

অহনা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল “আপনার পেমেন্ট আমার চাই না। দয়া করে আমাকে বাড়ি দিয়ে আসুন, ইনকাম ট্যাক্স  অফিসারদের আমার খুব ভয় লাগে”।

নীলাঞ্জন  বলল “ দেখুন, ভাল করে। একদম বাঘ ভাল্লুকের মত না। মানুষের মতই দেখতে।”

অহনা বলল “ফটোশ্যুটটা কি তবে বীণাদির জন্যই করলেন?”

নীলাঞ্জন হেসে দিল। তারপর বলল “আপনার প্রশ্নটার উত্তর দেবার আগে আমি একটা প্রশ্ন করব তার উত্তর দেবেন?”

অহনা বলল “বলুন”।

নীলাঞ্জন বলল “যেদিন আপনাকে প্রথম দেখেছি, আবেগহীন রোবটের মত মুখের আড়ালের অহনা সেনগুপ্ত আমাকে সেদিন থেকে স্পর্শ করে আছে। আমাকে বিয়ে করবেন?”

অহনা উত্তর দিল না।

বিয়ের এই কথাটাই এদ্দিন বাড়িতে যখন বাবা মা বলছিল তখন বিষ বিষ শোনাচ্ছিল, এখন কেমন অদ্ভুত ভাল লাগছিল তার কথাটা।

নীলাঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ফিক করে হেসে বলল “বাড়ি যাবার আগে ভাল কোথাও একটা ফুচকা খেতে হবে। তারপর একটা ম্যাগনাম। নিয়ম যখন ভাংলাম তখন ভাল করেই ভাঙি”...