Menu

অভীক অর্জুন দত্ত

prebooking

ঋজু ভালবাসে চান্দ্রেয়ীকে। সমস্যা হল চান্দ্রেয়ী বেড়াতে যাচ্ছে সিমলা।

ঋজুর ভালবাসার টান এমনই, তার ইচ্ছে হল চান্দ্রেয়ীকে দূর থেকে দেখবে সে বাবা মার সঙ্গে কেমন ঘুরছে। 

বন্ধুদের জোটাল এবং একই ট্রেনে রওনা দিল। 

ঘুরতে গিয়ে কী কী ঘটল, সেই নিয়েই এই উপন্যাস।

পথ হারাবো বলেই প্রি বুক করতে 9474381728 এ ২৫০ টাকা পাঠিয়ে নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, পেমেন্ট স্ক্রিণ শট মেইল করুন prebookpoth@gmail.com এ। বই আসছে মার্চের ২০ তারিখ। 

উপন্যাসের কিছুটা...


কালকা মেইল রাইট টাইমে ছেড়েছে।
সিটে গম্ভীরভাবে বসেছিল ঋজু। বাপ্পা, তন্ময় আর শুভায়ু তাস নিয়ে বসেছে।
গরম নেই তেমন। ট্রেনে ওঠার আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে।
বাপ্পা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাস শাফল করতে করতে বলল “কী রে, গম্ভীর হয়ে বসে না থেকে তাসটা ধরলে হয় না ভাই?”
শুভায়ু বলল “ভাইয়ের ফাটছে। এখন তাস খেলবে না মনে হয়”।
বাকি তিনজনই হাসল। বাপ্পা বলল “তোর ছমিয়া টু টিয়ারে যাচ্ছে আর তুই স্লিপারে। আওকাতটা বুঝেছিস তো ভাই?”
ঋজু গম্ভীর গলায় বলল “ফ্যামিলির সঙ্গে গেলে আমিও টু টিয়ারেই যেতাম। হ্যাজাস না ফালতু”।
বাপ্পা বলল “হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমাদের তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। কী কুক্ষণেই না তোর পাল্লায় পড়ে বেড়াতে এলাম। সারাক্ষণ ফলো করে যেতে হবে তেনাদের”।
শুভায়ু বলল “যা ভাই, গিয়ে জল টল লাগবে নাকি দেখে আয়”।
বাপ্পা ভালমানুষের মত গলায় বলল “টল এখন লাগবে না, টল দিয়ে কী করবে, ফ্যামিলি আছে তো”।
ঋজু কটমট করে বাপ্পার দিকে তাকাল।
বাপ্পা তড়িঘড়ি তাস দিতে থাকল।
শুভায়ু বলল “হোটেল ফোটেল পেলে হয় সিমলায়”।
বাপ্পা বলল “না পেলে ঋজুর শ্বশুরকে বলব। কাকু কাকু ঘরের ব্যবস্থা কর”।
ঋজু কিছু বলল না। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল।
একটা বাচ্চা তাদের সামনে ঘুর ঘুর করতে লাগল। বাচ্চার মা এসে বাচ্চাটাকে নিয়ে গেল।
বাপ্পা আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে বলল “সব ভাল ভাল মেয়েগুলো তাড়াতাড়ি মা হয়ে যাচ্ছে”!
ঋজু বিরক্ত গলায় বলল “তোদের সঙ্গে আসাটাই ভুল হয়েছে। মার ধোর না খেয়ে যাই”।
বাপ্পা মিটমিটে চোখে শুভায়ুর দিকে তাকাল। শুভায়ু তাস দেখছিল। বলল “ঋজু সিরিয়াসলি বল তো, তোর কি ধারণা চান্দ্রেয়ী ডবল সিম মারছে?”
ঋজু বলল “তা কেন ধারণা হবে?”
শুভায়ু বলল “তাহলে হঠাৎ করে সিমলা ট্যুরের প্রোগ্রাম করলি কেন? ওরা ঘুরে ফিরে যেত, সমস্যা কী?”
ঋজু বলল “প্রেম করলে বুঝতে পারতিস”।
শুভায়ু বলল “প্রেম আর করতে হবে না। তোকে দেখে প্রেমের ওপর থেকে সমস্ত মোহ চলে গেছে ভাই। যা শুরু করেছিস! কী না, গার্লফ্রেন্ড বেড়াতে যাচ্ছে দেখে তোকেও যেতে হবে। চোখে হারানো যাবে না! কী দাবী মাইরি”।
ঋজু কিছু বলল না। বাকি তিনজনে তাস খেলতে লাগল।
খানিকক্ষণ পরে ট্রেন বর্ধমান পৌঁছল। সবাই চা নিল। ট্রেন ছাড়লে বাপ্পা বলল “কীরে, এখানের বাকি দুটো সিটে তো কেউ এল না”!
শুভায়ু বলল “আসার দরকার নেই। ফাঁকা থাক”।
তন্ময় বলল “ওরম মনে হয়, টিটি মামা সব বেচে দেবে চাপ নিস না”।
তিনজনে আবার তাস খেলতে শুরু করল। ঋজু দেখল চান্দ্রেয়ী মেসেজ করেছে “খেয়েছ?”
ঋজু লিখল “না, দুর্গাপুর পেরলে খাব। তোমরা খেলে?”
চান্দ্রেয়ী লিখল “হ্যাঁ, জাস্ট। পরোটা মাংস। খেও কিন্তু”।
ঋজু লিখল “হ্যাঁ, হ্যাঁ খাব। আশে পাশে কোন হ্যান্ডু ছেলে আছে নাকি?”
চান্দ্রেয়ী লিখল “আছে তো, সামনেই বসে”।
ঋজুর জ্বলল একটু, পরক্ষণেই মনে হল চান্দ্রেয়ী ঢপ মারছে। লিখল “ছবি দেখাও”।
চান্দ্রেয়ী হেসে গড়িয়ে পড়ার স্মাইলি দিল।
ঋজু লিখল “বাবা কী করছে?”
চান্দ্রেয়ী লিখল “বই পড়ছে। এই শোন আমি ঘুমাই এখন। বাবা কেমন কেমন চোখে তাকাচ্ছে”।
ঋজু গুডনাইট পাঠিয়ে ফোনটা রাখল। রাত ন’টা পনেরো। কাল গোটা দিন ট্রেনে কাটাতে হবে।
টিটি এসে গেছেন। টিকেট চেক হচ্ছে। তাদের দুটো সিট খালি যাচ্ছে। দু চারজন ওয়েটিং লিস্টে থাকা লোক ভিড় করছেন। টিটি বোঝাচ্ছেন তাদের। ট্রেন একটু পরেই দুর্গাপুর দাঁড়াল। সিট দুটো সেটিং হচ্ছিল, এমন সময় একজন দৌড়তে দৌড়তে এসে টিটিকে বলল “স্যার, ফরটি ফাইভ ফরটি সিক্স আমাদের”।
টিটি ছেলেটার দিকে রেগে তাকিয়ে বললেন “এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”
ছেলেটা কাচুমাচু মুখে বলল “দুর্গাপুর থেকে উঠলাম স্যার”।
টিটি বলল “টিকেট হাওড়া থেকে আর উঠছ দুর্গাপুর থেকে? ইয়ার্কি হচ্ছে? যা ইচ্ছা তাই নিয়ম করা যায় নাকি?”
ছেলেটা চেপে গেল। টিটি গজগজ করতে করতে ছেলেটার টিকিট চেক করে দিল। সিট বিক্রি করতে না পারার হতাশা টিটির চোখে মুখে।
ছেলেটা হাফাচ্ছিল। একটা ব্যাগ নিয়ে আপার বার্থে উঠে পড়ল।
ছেলেটার সঙ্গের মেয়েটাকে এতক্ষণে চোখে পড়ল ঋজুর।
কুন্ঠাভরে ছেলেটার আপার বার্থে উঠে যাওয়া দেখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল “আমাকে কেউ একজন একটা লোয়ার বার্থ ছেড়ে দেবেন, আমি উপরে উঠতে পারি না”।
 


ডিনারের পর মালিনী বিছানা করছিলেন। বিছানা বলতে তেমন কিছুই না। ট্রেনের সিটে চাদর পেতে দেওয়া। ট্রেনের বেডিং খুব একটা পছন্দ করেন না তিনি। তবু কিছু করার নেই। পথের জিনিস। পথে অত বায়ুগ্রস্থ হলে চলে না।
সৌরেন গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন। সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছিল। ট্রেনে হাজার ঝামেলা। অত ঝামেলা করে স্মোক করতে ইচ্ছা করছিল না।
চান্দ্রেয়ী মোবাইলে গান শুনছিল। তাদের সঙ্গে আরেক ভদ্রলোক যাচ্ছেন, ট্রেনে উঠেই উপরের বাঙ্কে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
সৌরেন মালিনীকে বললেন “ওষুধ খেয়েছ?”
মালিনী বিছানা করে বসলেন, “হ্যাঁ। তুমি শোও এবার। কাল সারাদিন ট্রেনে থাকতে হবে”।
সৌরেন বিরক্ত স্বরে বললেন “হ্যাঁ, তা আর বলতে। মামণি ঘুমাবে না?”
মালিনী মেয়ের দিকে রাগী চোখে তাকালেন। চান্দ্রেয়ী কান থেকে হেডফোন নামিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল “কী হল?”
মালিনী বললেন “ঘুমো এবার। কান এবং চোখ দুটোকে বিশ্রাম দে এবার। বাড়িতে তো সারাক্ষণ এদের সঙ্গেই কাটিয়ে যাচ্ছিস। বেড়াতে যাচ্ছিস যখন, আমাদের সঙ্গে তো কিছুক্ষণ কাটানো যায় নাকি?”
চান্দ্রেয়ী বিরক্ত মুখে কান থেকে হেডফোন খুলে মোবাইলে গান বন্ধ করল। বলল “বল কী বলবে?”
মালিনী রাগলেন খানিকটা “সীন ক্রিয়েট করবি না এখানে”।
সৌরেন হাত তুললেন “আহ, রেগে যাচ্ছ কেন! এখানে আবার এসব কেন?”
মালিনী চান্দ্রেয়ীর দিকে কড়া চোখে তাকালেন। চান্দ্রেয়ী বাবার দিকে তাকাল “এখন তো ঘুমিয়ে পড়ব, কাল কথা বলি?”
মালিনী সৌরেনের দিকে তাকালেন “দাও কিনে আরও দামী ফোন! কত করে বললাম আগে কলেজ থেকে বেরোক”।
সৌরেন উঠলেন “বাথরুম হয়ে আসছি। তোমরা শুয়ে পড়”।
মালিনী গজগজ করতে লাগলেন। সৌরেন বেরোলেন। এসির তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমছে, রাতের দিকে ভালই ঠান্ডা লাগবে বোঝা যাচ্ছে। কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে এলে ট্রেনের ঝাঁকুনি অনেক বেশি বোঝা যায়। এক যুবক দরজা খুলে সিগারেট খাচ্ছে। এক হাত দরজায় এক হাত সিগারেটে। সৌরেনের ভয় লাগল। এই গতিতে এভাবে সিগারেট খাওয়া যথেষ্ট ঝুঁকির কাজ। তাছাড়া ট্রেনে স্মোকিং নিষিদ্ধ। বাথরুমেও খেতে পারত ছেলেটা। টিটি ধরলে নিশ্চয়ই ফাইন করবে। সৌরেন কিছু বলবেন ভেবেও হাল ছাড়লেন। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের সিটে ফিরে এলেন। উপরের বাঙ্কে উঠলেন। মা মেয়ে লোয়ারে শোবে।
আসানসোল দাঁড়াল ট্রেন। কয়েক জন উঠলেন। মালিনী বললেন “ফোনটা এখনও রাখে নি দেখো”।
সৌরেন বললেন “ছাড়ো”।
মালিনী বললেন “ট্যুর এজেন্সিকে ফোন করবে মনে করাতে বলেছিলে”।
সৌরেন বললেন “করেছি”।
মালিনী বললেন “কখন করলে?”
সৌরেন বললেন “খানিকক্ষণ আগেই”।
মালিনী বললেন “তাহলে তো ভালই। আমি ঘুমালাম”।
সৌরেন বললেন “ঘুমাও”।
মালিনী নাক ডাকেন। কোথাও গেলে সহযাত্রীরা উষ্মা প্রকাশ করেন। প্রতিবারই সৌরেন এবং চান্দ্রেয়ী গুটিয়ে থাকেন।
ট্রেন আসানসোল ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই মালিনীর নাক ডাকার শব্দ আসতে শুরু করল। অবশ্য শুধু মাত্র মালিনী না, অনেকেরই নাক ডাকছে। চান্দ্রেয়ী কান থেকে হেডফোন নামিয়ে বলল “দেখো বাবা, মার শুরু হয়ে গেল”।
ট্রেনের ঝাঁকুনিতে সৌরেনের চোখ বুজে আসছিল। বললেন “তুই ঘুমিয়ে পড়। টাকা দিয়ে টিকেট কেটেছি। কেউ কিছু বললে দেখা যাবে”।
চান্দ্রেয়ী চুপ করে গেল।
সৌরেন টের পেলেন প্যান্টের পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করছে। খেয়াল ছিল না। আগে জানলে ফোনটা বের করে ট্রেনের নেটের পকেটে রাখতেন।
ফোন বের করে দেখলেন তনয়া ফোন করছে। বিরক্ত হলেন। এই সময় ফোন করার কথা না।
ফোনটা কেটে আপার বাঙ্ক থেকে নেমে বাথরুমের দিকে রওনা দিলেন। ফোনটা আবার বাজছে। কেটে দিলেন এবারেও। কাঁচের দরজা খুলে দেখলেন যুবকটি এখনও দরজা খোলা রেখেই দাঁড়িয়ে আছে।
বাথরুমে গিয়ে তনয়াকে ফোন করলেন, একবার রিং হতেই ধরল তনয়া “ঠিক ঠাক ট্রেনে উঠেছ?”
সৌরেন বিরক্ত গলায় বললেন “এখানে ফোন করতে বারণ করেছিলাম। তাছাড়া টাওয়ারও পাব না। কেটে যাবে যে কোন সময়”।
তনয়া আহত গলায় বললেন “একটা এস এম এস করতে কী হত? তুমি না হয় মেয়ে বউ নিয়ে ফুর্তি করতে যাচ্ছ, আমাকে তো সেই একা একাই থাকতে হচ্ছে”।
ট্রেনের শব্দ অনেকগুণ বেশি আসছে যদিও তবু তনয়ার গলা ঠিকঠাকই শুনতে পাচ্ছিলেন সৌরেন।
সৌরেন বললেন “তার জন্য যথেষ্ট টাকা দিয়ে এসেছি তোমাকে, রাহুলকে নিয়ে কোথাও ঘুরে এলেই পারো”।
তনয়া বললেন “তোমার সঙ্গে নিয়ে গেলেই পারতে। বউকে বলতে অফিসের কলিগ। কী এমন হত?”
সৌরেন বললেন “বেশ। পরের বার নিয়ে আসব। রাখছি এখন”।
তনয়া বললেন “মালিনী ঘুমিয়েছে?”
সৌরেন বললেন “এ প্রশ্ন কেন?”
তনয়া বললেন “এত বিরক্ত হয়ে হয়ে কথা বলছ কেন? আমার প্রয়োজন কি ফুরিয়েছে?”
সৌরেন বললেন “ট্রেনে শুনতে পারছি না কিছু। পরশু চণ্ডীগড়ে পৌঁছে ফোন করছি। রাখো এখন”।
তনয়া বললেন “তোমাকে একটা কথা বলব?”
সৌরেন বিরক্ত গলায় বললেন “বল যা বলবে”।
তনয়া বললেন “তোমার মেয়ে প্রেম করছে। এদিক সেদিক ঘুরছেও। মাঝে একবার বকখালি গেছিল। সে ছেলে তোমাদের সঙ্গে একই ট্রেনে আছে। মেয়ে বড় হয়ে গেছে সৌরেন”।
সৌরেন হতভম্ব হলেন, বললেন “তুমি এত খবর কী করে জানলে? আর এখন এই ট্রেনের মধ্যে কথাটা বলছ?”
তনয়া গম্ভীর গলায় বললেন “রাখছি এখন, ট্রেন থেকে নেমে ফোন কোর”।
ফোনটা কেটে গেল।
সৌরেন তড়িঘড়ি তনয়ার নাম্বারে ডায়াল করতে লাগলেন। ফোন সুইচড অফ বলতে লাগল।
 

 


ট্রেন হাজারিবাগে দাঁড়িয়ে আছে।
এক মিনিট দাঁড়াবার কথা ছিল। অনেকক্ষণ হয়ে গেল নড়ছে না।
ঋজু মিডল বার্থে শুয়েছিল। গরম লাগছিল তার।
নেমে দরজার কাছে গেল।
দেখল দুর্গাপুর থেকে ট্রেনে ওঠা ছেলেটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
ঋজু বলল “ট্রেন কিন্তু ছেড়ে দেবে যে কোন সময়”।
ছেলেটা হাসল। বলল “সিগন্যাল নেই তো। উঠে যাব, চাপ নেই”।
ঋজু বলল “আপনি কলকাতার?”
ছেলেটা বলল “হ্যাঁ। ও দুর্গাপুরের”।
ঋজু বলল “ওহ। হানিমুন?”
ছেলেটা অন্যমনস্কভাবে সিগারেট টানতে টানতে বলল “হু”।
ঋজু সিগন্যালের দিকে তাকাল। এখনও লাল হয়ে আছে। শুনশান স্টেশন। দু চারজন এদিক সেদিক বেডিং পেতে ঘুমিয়ে আছে। ট্রেনের সবাই ঘুমাচ্ছে।
ঋজু ট্রেন থেকে নেমে বলল “ছোটবেলায় কোথাও বেড়াতে গেলে বাবা যখন ট্রেন থেকে নামত ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম। যতক্ষণ না ট্রেনে উঠত, টেনশন হত খুব”।
ছেলেটা আনমনে বলল “আমার কোনকালেই বাবা ছিল না”।
ঋজু বলল “ওহ, আই অ্যাম সরি। মারা গেছেন?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল, “কোনকালেই দেখি নি”।
ঋজু বলল “ওহ”।
ছেলেটা ঘড়ি দেখল “একটা কুড়ি। বাড়িতে থাকলে এই সময়টা জেগেই থাকতাম”।
ঋজু হাসল “আমিও। ফোন করি”।
ছেলেটা বলল “কাল অবধি তাই করেছি”।
ঋজু অবাক হল “মানে? প্রেম করে বিয়ে? পালিয়েছেন নাকি?”
ছেলেটা ঋজুর দিকে তাকিয়ে হাসল “হ্যাঁ। আজকেই। ওদের বাড়ির লোক জেনে গেছে হয়ত এতক্ষণে”।
ঋজু হাঁ করে ছেলেটার দিকে তাকাল।
ছেলেটা বলল “অবাক হবার কিছু নেই। পালানোটা খুব কমন আজকাল। প্ল্যানিং করে টিকিট কেটে ছিলাম মাস কয়েক আগে। তবে সমস্যাটা অন্য। আমি বেকার ছেলে। পকেটে এই মুহূর্তে দেড়শো টাকা পড়ে আছে। এক বন্ধু কথা দিয়েছিল হাজার দশেক টাকা ধার দেবে, শেষমুহূর্তে তাকে আর খুঁজে পেলাম না। অনেকবার ফোন করেছিলাম ফোনও ধরে নি। কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না”।
একটা চা ওয়ালা চলে এল কোথা থেকে। ঋজু বলল “চা খাবেন?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
ঋজু চা নিল, অন্য সময় হলে নিত না, ছেলেটার কথা শুনে কী বলবে ঠিক করতে পারছিল না।
ছেলেটা বলল “আপনার বন্ধুরা সবাই ঘুমোচ্ছে। আপনি ঘুমোবেন না?”
ঋজু বলল “ঘুম পাচ্ছে না ঠিক”।
ছেলেটা আরেকটা সিগারেট ধরাল “ও খুব ক্লান্ত। সকাল থেকে খুব টেনশন গেছে। এখন মরার মত ঘুমোচ্ছে”।
ঋজু বলল “ওহ”।
ছেলেটা বলল “আমার উল্টো হয়। টেনশনেও ঘুম হয় না, টেনশন শেষ হয়ে গেলেও ঘুম হয় না। আপনি কখনও হাজারিবাগে এসেছেন আগে?”
ঋজু চুপচাপ চা খাচ্ছিল। বলল “নাহ, আসিনি”।
ছেলেটা বলল “ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম। সাত আট বছর বয়স হবে। মার এক ক্লায়েন্ট নিয়ে এসেছিল। এখনো মনে আছে লোকটা মাকে একটা ঘরে নিয়ে চলে গেল, আমাকে একটা ছোট গাড়ি দিয়েছিল খেলার জন্য। আমি খানিকক্ষণ গাড়িটা নিয়ে খেলে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিলাম। একটা লম্বা লোক, ইয়া গোঁফ, আমাকে কোলে নিয়ে কত কিছু বোঝাচ্ছিল, আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না”।
ছেলেটা চুপ করে গেল।
ঋজুর চা শেষ হয়ে গেছিল। ছেলেটার কথা শুনে তার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল।
একটু ইতস্তত করে বলল “আমি গিয়ে শুই বরং। আপনি চলে আসুন”।
ছেলেটা বলল “হ্যাঁ। আপনি ভেতরে যান”।
ঋজু ট্রেনে উঠে বাথরুমে গেল। ছেলেটার মধ্যে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা আছে, বেশিক্ষণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলা যায় না। যেটুকু বোঝা গেল ছেলেটা মেয়েটাকে নিয়ে প্ল্যান করে বাড়ি থেকে পালিয়েছে কিন্তু পকেটে টাকা কড়ি নেই। সে ঠিক করল বাকি তিন জনের সঙ্গে কথা বলে ওদের নিজেদের সঙ্গে নিয়ে নেবে। পরে দেখা যাবে, যা হবে হবে।
ট্রেনটা নড়ে উঠল।
ঋজু বাথরুম থেকে বেরিয়ে মিডল বার্থে উঠে শুল।
ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম এসে গেল তার।
একটানা ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ঘুম ভাংল চ্যাঁচামেচি আর কান্নাকাটির শব্দে। ধড়মড় করে উঠে বসে বিরক্ত গলায় বলল “কী হল, এত ক্যাওয়াস কীসের?”
বাপ্পা বলল “আরে ভাই দুর্গাপুর থেকে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে উঠল না?”
ঋজু ঘুম জড়ানো গলায় বলল “হ্যাঁ। কী হয়েছে?”
বাপ্পা বলল “আরে ছেলেটা মাঝপথে কোনো একটা স্টেশনে নেমে গেছে। মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করেছে”।
ঋজু হাঁ করে বাপ্পার দিকে তাকিয়ে থাকল।
 


ভোর সাড়ে চারটে। সৌরেনের ঘুম ভেঙে গেল।
অন্যান্যদিন বাড়িতে থাকলে এই সময়ে কোনকালেই ঘুম ভাঙে না।
ট্রেনে একটা অস্বস্তি কাজ করে। তার ওপরে তনয়ার কথাটা শোনার পর থেকে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। মেয়েটা কখন যে বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারলেন না। এই তো কিছুদিন আগেও বাবা বলতে অজ্ঞান ছিল।
তাহলে কি মালিনীই ঠিক? ফোনটা দেওয়াই ভুল হয়েছে? ঠিকই তো, মেয়েটা ফোন পাবার পর থেকেই কেমন যেন দূরে সরে গেল। সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত, ফোন দেখে নিজের মনেই হাসছে, কখনও কখনও ছাদে চলে যাচ্ছে, প্রথম প্রথম খুব একটা আমল দেন নি, এখন মনে হচ্ছে দিতে হবে।
ট্রেন বেশ ভালো জোরে চলছে। কামরার ভেতরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সৌরেন উঠে বেশ খানিকক্ষণ কমোডে বসে বুঝলেন বৃথা চেষ্টা। জায়গা পরিবর্তন হলেই পেট পরিষ্কার হওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। বয়স যত বাড়ছে বাওয়েল মুভমেন্টে সমস্যা হচ্ছে।
সিগারেট খেতে পারলে খানিকটা লাভ হত হয়ত।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে করিডরে হাঁটতে শুরু করলেন।
দু চারজন বাদে ট্রেনের সবাই ঘুমোচ্ছে।
তারা নামবে সামনেই কোন স্টেশনে।
সৌরেন বুঝতে পারলেন না কোন স্টেশন আসছে।
নিজের বাঙ্কে উঠে শুলেন। বেশ খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করলেন। তনয়ার কথাটা আবার মাথায় এল।
মেয়ের প্রেমিক। এই বয়সে? কী করে সে ছেলে? তার মনে পড়ে গেল স্কুল লাইফে এক মেয়ের প্রতি টান ছিল। মেয়েটা শ্যামবাজারের দিকে থাকত। দাঁড়িয়ে থাকতেন বাড়ির সামনে, সে সময় মেয়েটা টিউশন পড়তে যেত। তখন মোবাইল ছিল না কিছুই ছিল না।
আজকাল সব কিছু কত সহজ হয়ে যাচ্ছে।
এর আগে চান্দ্রেয়ীর জন্য একটা ছেলে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। বুঝতেন সৌরেন।
প্রথমে কিছু বলেন নি। একদিন গাড়ি নিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় দেখলেন মেয়েও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে। সে সময়টা চুপচাপ ছিলেন। চান্দ্রেয়ী ঘরের ভিতর ঢুকতেই বিকাশদের ফোন করে ডেকে নিয়েছিলেন। ছেলেটাকে ক্লাবে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মার ধোর করা হয়েছিল। হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছিল। তারপর থেকে কোন রকম জ্বালাতন হয় নি।
এবারেও কি সেই ছেলেটাই? সৌরেনের বিরক্ত লাগছিল। মালিনীর সঙ্গে কোথাও গেলেই তনয়া এরকম অদ্ভুত আচরণ শুরু করে দেয়। বলে দিলে কী সমস্যা হত? অথচ তনয়াকেও তো কম গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
সৌরেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শরীরের জৈবিক চাহিদার জন্য যে জীবনে কতরকম আপস করতে হয়!
মালিনী বিকট স্বরে নাক ডাকছেন। বিরক্ত হয়ে খানিকক্ষণ শুয়ে থাকলেন সৌরেন।
খানিকক্ষণ পরে এক স্টেশনে এসে ট্রেন দাঁড়াল। অদ্ভুত নাম স্টেশনটার। “ভাবুয়া রোড”।
বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না হয়ত।
সৌরেন বাঙ্ক থেকে নেমে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
প্ল্যাটফর্মের মধ্যে এক চা ওয়ালাকে দেখে ডাকলেন। দুধ চা নিলেন। বাড়িতে থাকলে দুধ বর্জন করেন, এখানে ইচ্ছা করেই দুধ নিলেন। “পথে নিয়ম নাস্তি” আপ্তবাক্য মনে পড়ে গেল।
এক যুবক যুবতী সম্ভবত হানিমুনে যাচ্ছে। একসঙ্গে উঠে বাথরুমে যাচ্ছে হাত ধরাধরি করে। সৌরেনের নিজেদের হানিমুনের কথা মনে পড়ে গেল। মালিনী একটা সময় কত রোগা ছিল! এখন দেখলে কে বলবে! শারীরিক কোন রকম আকর্ষণও জন্মায় না আজকাল মালিনীকে দেখলে।
শেষবার কবে একত্রিত হয়েছিলেন? মনে করতে গিয়ে হাল ছেড়ে দিলেন সৌরেন।
তনয়া ছিল বলেই হয়ত অনেকটা শূন্যতা পূর্ণ হয় তার।
চা শেষ হতেই ট্রেনটা দুলে উঠল। সৌরেন কামরার মধ্যে প্রবেশ করলেন।
হানিমুন কাপল বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘনিষ্ঠভাবে চুমু খাচ্ছে।
সৌরেনের হঠাৎ মনে হল, এরা নিজেদের মুখের গন্ধ পায় না? মর্নিং ব্রেথ?
পরক্ষণেই মনে হল, বয়স হচ্ছে বলেই হয়ত এসব বেয়াড়া প্রশ্ন মাথায় আসে।
 


সকাল দশটা। ট্রেন এলাহাবাদে পৌঁছেছে। মেয়েটি চুপ করে বসে আছে জানলার কোণায়। প্ল্যাটফর্মে নেমে চারজন চা খাচ্ছে।
ঋজু খানিকটা চুপ হয়ে গেছে, বাপ্পা উত্তেজিত গলায় বলল “এবার কী করবি?”
শুভায়ু বলল “আমরা কী করব? মেয়েটাকে তো বারবার বলা হচ্ছে বাড়ির ফোন নাম্বার দিতে, কিছুতেই দিচ্ছে না দেখছিস তো!”
বাপ্পা বলল “দেখ ভাই, ভাল কথা বলি, আমরা জানিও না কী কেস, আদৌ গোটাটাই গট আপ কী না, এরকম হয় শুনেছি আমি ট্রেনে, আমরা কেন অত চাপ নিচ্ছি, মেয়েটা যা ইচ্ছা সেটাই করুক না, আমাদের কী?”
তন্ময় মাথা নাড়ল “আমারও তাই মনে হয়। আমরা এমন করছি যেন বাপের বিয়ে লেগেছে, এসব ব্যাপারে তো এত চাপ নেবার কিছু হয় নি। ছেলের কুড়কুড়ি উঠেছিল, ছেলে মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে, মাঝরাস্তায় কুড়কুড়ি নেমে গেছে, ছেলেও নেমে গেছে, এবার মেয়ে কী করবে তার দায় আমাদের কেন থাকবে?”
সিগন্যাল হয়ে গেছিল। ঋজু কিছু না বলে ট্রেনে উঠল। তার দেখা দেখি বাকিরাও উঠল।
বাপ্পা ফিসফিস করে বলল “সকালে ভাল করে হাগতেও পারলাম না, কোন বাথরুমেই এখনো স্বচ্ছ ভারত অভিযান হল না আর তার মধ্যে এত সব ঝাম শুরু হয়ে গেল”।
শুভায়ু বলল “এসিতে গিয়ে হেগে আয় না, কে দেখতে যাচ্ছে”।
বাপ্পা বলল “তারপর রেল পুলিশ আমার পেছনে রুল ঢুকিয়ে বাকি হাগাটাও বের করে নিক আর কী!”
ঋজু বিরক্ত গলায় বলল “থাম ভাই, ট্রেনে অনেক লোক যাচ্ছে, শুনতে পেলে বাজে ব্যাপার”।
ট্রেন নড়ে উঠল। তারা নিজেদের সিটের দিকে এগোল। শুভায়ু জানলার ধারে গিয়ে বসল।
ঋজু মেয়েটাকে বলল “আপনি কিছু ভাবলেন?”
মেয়েটা শূন্য দৃষ্টিতে ঋজুর দিকে তাকিয়ে বলল “দেখছি, দিল্লিতে আমার পিসি থাকে, ফোন করে নেব”।
বাপ্পা খুশি মুখে ঋজুর দিকে তাকাল। বোঝাতে চাইল, যাক, ফাঁড়া কেটে গেছে।
ঋজু কিছু বলল না। চান্দ্রেয়ী মেসেজ করেছে “কী করছ? খেয়েছ?”
ঋজু লিখল “এবার খাব। তোমরা খেলে?”
“হ্যাঁ। সেই সেম ওল্ড ব্রেকফাস্ট। খেয়ে নাও”।
ট্রেনের প্যান্ট্রি কারের ছেলেটা ব্রেকফাস্ট নিয়ে ঘুরছিল। ঋজু বাপ্পাকে বলল “ডাক দে প্যান্ট্রি কারের ছেলেটাকে। খেয়ে নি”।
বাপ্পা ইয়ার্কি মেরে বলল “প্যান্টি কার?”
পরক্ষণেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সচেতন হয়ে নড়ে চড়ে উঠে দাঁড়াল “দাঁড়া দাঁড়া ডাকছি”।
তন্ময় মোবাইলে খুট খুট করতে করতে বলল “সিমলায় বেশি শীত নেই, মানালিতে ফাটবে”।
শুভায়ু বলল “তাতে কী, সোয়েটার নিয়েছিস তো?”
তন্ময় বলল “তা নিয়েছি। তবে ছোটবেলায় একবার গেছিলাম। হেবি শীত ছিল, এবার সেরকম বুঝলে হোটেলের কম্বল জড়িয়ে বেরোব”।
ঋজুর ফোন বাজছিল। ঋজু দেখল বাবা, সে ফোনটা নিয়ে উঠে বাইরের দিকে গেল, বলল “বল”।
“কোথায় এখন?”
“এলাহাবাদ পেরোলাম”।
“ভাল। সকালে খাওয়া দাওয়া হয়েছে?”
“হ্যাঁ। আর সব ঠিক আছে?”
“হ্যাঁ। তুমি অফিস বেরিয়ে গেছ?”
“এই বেরোব। সাবধানে থাকিস, আজ তো সারাদিন ট্রেনে”?
“হ্যাঁ। কাল ভোররাতে নামব যদি রাইট টাইম থাকে”।
“এখন তো রাইট টাইমই যাচ্ছে?”
“মোটামুটি, আধঘন্টা এক ঘন্টা লেট”।
“আধঘন্টা মেক আপ হয়ে যায়, চিন্তার কিছু নেই”।
“হ্যাঁ...”। ঋজু একটু ইতস্তত করল।
“কিছু বলবি?”
“বলছি বাবা একটা সমস্যা তৈরী হয়েছে”।
“কী সমস্যা?”
“একটা কাপল উঠেছিল আর কী। তার মধ্যে থেকে ছেলেটা পালিয়েছে, মেয়েটা একা যাচ্ছে”।
“ওহ, এগুলো খুব পুরনো ট্রিক ঋজু। সাবধানে থাক”।
“বুঝেছি বাবা, রাখছি এখন”।
“ওকে। কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি, এদের কিন্তু আমি খুব ভাল করে চিনি। দূরে থাকবি। আমি দুপুরে আবার ফোন করছি”।
ঋজু মাথায় হাত দিল। কথাটা বাবাকে না বললেই ভাল হত। এবার পরপর ফোন করে এই একই কথা বলে যেতে থাকবে।
ট্রেনের দরজা খোলা। গরম হাওয়া ঢুকছে। উত্তরপ্রদেশের গরম কুখ্যাত। ট্রেন চললেও জানলা দিয়ে লু আসতে শুরু করবে এর পরে। বাথরুমের জল গরম হয়ে যাবে। গোটা দিনটা স্নান না করে থাকতে হবে ভাবতেই ঋজুর জ্বর চলে আসছিল। বাথরুমগুলোও খুব একটা পরিষ্কার নয়। ট্রেনে না চড়লে বোঝা যায় না কিছু মানুষের টয়লেট ট্রেনিং এখনো লোয়ার নার্সারি ষ্ট্যাণ্ডার্ডেই পড়ে আছে।
ঋজু সিটে গিয়ে দেখল সবাই ব্রেকফাস্ট খাওয়া শুরু করেছে। মেয়েটাও। একটু জোরেই খাচ্ছে। সম্ভবত খিদে পেয়েছিল খুব বেশি। বাপ্পা বলল “খেয়ে নে ভাই, কানপুরে লাঞ্চ বলে দিয়েছি। ডিম। পার পাব্লিক দুখান ডিম”।
ঋজু নিজের ব্রেকফাস্টের প্যাকেটটা হাতে নিল। এরা পাউরুটি সেঁকে দেয় না। কাঁচা পাউরুটিই দিয়ে দেয়। অন্যান্য সময় হলে ঋজু খেত না। ট্রেনে খিদে পেয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি।
বাপ্পা মেয়েটাকে বলল “দিল্লিতে পিসির বাড়ি চেনেন তো?”
মেয়েটা খেতে খেতে বলল “ফোন করে নেব, ঠিকানা আছে ব্যাগে”।
ঋজু একটা পাউরুটি আর খানিকটা অমলেট খেল।
শুভায়ু ঋজুর দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল “যা ভাই, বউদির কোচ ঘুরে আয়। এসি টু টিয়ার। উইব্বাস!”
ঋজু শুভায়ুর দিকে কটমট করে তাকাল।
 

 


ভদ্রলোকটি গম্ভীর হয়ে সৌরেনের দিকে তাকিয়ে বললেন “ক্যান ইউ ইমাজিন? এত টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ইঁদুর দেখতে হবে ট্রেনে? স্টেটসে থাকলে এতক্ষণে তুলকালাম হয়ে যেত”!
মুঘলসরাইতে আগে যিনি আপার বাঙ্কে ছিলেন, তিনি নেমে গেছেন। এই ভদ্রলোক ওখান থেকেই উঠেছেন।
সৌরেন জানলা দিয়ে ট্রেনের বাইরে দিকে তাকিয়ে বললেন “ট্যুইট করে দিন রেলমন্ত্রকে, ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।
ভদ্রলোক গম্ভীর হয়ে হাত দিয়ে সৌরেনের কথা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বললেন “হোয়াট দ্য হেল, ট্যুইট করতে হলে নেটওয়ার্ক দরকার তো, এখানে নেটওয়ার্ক কোথায়? পাচ্ছিই না কিছু। আসছে যাচ্ছে”।
চান্দ্রেয়ী ফুট কাটল “কোন স্টেশনে দাঁড়ালে ওয়াই ফাই ইউজ করতে পারেন। প্রায় সব স্টেশনেই আছে”।
সৌরেন বললেন “আপনি বেসিক্যালি বাঙালি? মানে ওয়েস্টবেঙ্গলে বাড়ি?”
ভদ্রলোক বললেন “হ্যাঁ, এখন পশ্চিমবঙ্গে, অরিজিন পূর্ববঙ্গ, কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়েই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। ভেবেছিলাম স্টেটসে আর সেটল করব না, দেশে ফিরে সোশ্যাল সারভিস করব, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হিমালয়ান মিস্টেক করেছি”।
ভদ্রলোক জোরে একটা শ্বাস ছাড়লেন।
সৌরেন চান্দ্রেয়ীর দিকে তাকালেন। মোবাইলে নিশ্চয়ই টাওয়ার পাচ্ছে, নইলে এত খুট খুট করবে কেন। সৌরেন ভাবতে চেষ্টা করলেন এখন নিশ্চয়ই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলছে। ছেলেটা কী করে, কোন বাড়ি, কী জাত... সৌরেনের বিরক্ত লাগছিল। মালিনী থপথপে কোলা ব্যাঙের মত বসে রয়েছে। মাঝে মাঝেই এক গাদা কুকিজ বের করে খাচ্ছে। বাড়িতেও এই চলে। কুকিজ, ব্রাউনি সব খাবে, তারপরে পনেরো মিনিট রাস্তায় হেঁটে হাফাতে হাফাতে এসে বলবে “উফ, অনেক পরিশ্রম হয়ে গেল”।
সৌরেন নিজের মনেই মালিনীর সঙ্গে তনয়ার তুলনা করে নিলেন। তনয়া স্লিম নয় একেবারেই একটু মোটার দিকে কিন্তু কার্ভি, সেক্সি তো বটেই। নব যুবকদের ফ্যান্টাসি করার আদর্শ।
হয়ত আছেও কেউ। সৌরেনের বুকের ভিতর খানিকটা চিনচিন করল। টাকার সম্পর্কও কখনও কখনও হৃদযন্ত্রে ঢেউ তোলে। এ এক অদ্ভুত অবস্থা।
আরেকটু ভেবে দেখলেন এই থপথপে মালিনীকেও কেউ প্রেম করার চেষ্টা করলে একই ভাবে হিংসা করবেন। এই যে তার মেয়ে, এত বড় হয়েছে, একটা সময় এত বাবা বাবা করত, এখন অন্য কোন অজানা ছেলের সঙ্গে প্রেম করছে মনে পড়তেই কেমন কেমন লাগছে তার।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সৌরেন। এই বেড়াতে যাওয়াটাই মালিনীর পরিবর্তে তনয়া গেলে অন্যরকম হত।
ভদ্রলোক বললেন “ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলাম বুঝলেন, সে ব্যবস্থা শুনলেই মাথা খারাপ হয়ে যাবে, আর অ্যামট্রেকের কথা তো ছেড়েই দিলাম। না মানে জাস্ট ভাবুন, ওরা পারছে আমরা পারব না কেন? লোকে দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষে জানতাম, এ দেখি ইঁদুর পোষে। কী সর্বনাশ। ঘুমাচ্ছি আর ইঁদুর যদি এসে... উফ ভাবতেই পারছি না”।
ভদ্রলোক শিউরে ওঠার ভঙ্গি করলেন।
সৌরেনের বিরক্ত লাগছিল। লোকটার কথা বেশি বলার স্বভাব আছে বোধ হচ্ছে। সিডি কেটে গেলে যেভাবে একই জিনিস রিপিটেডলি হতে থাকে, ভদ্রলোকের সম্ভবত সেই রোগ আছে। ক্যালিফোর্নিয়া ভাল তো ওখানেই থাক না বাপু, এদেশে কেন? সৌরেনের অনেকক্ষণ পরে একটা গালাগালি মনে পড়ল। “শো অফ চোদা”। এই টাইপের মালগুলো একবার বিদেশ থেকে ফেরার পরে সেথায় এই ভাল ছিল, ঐ ভাল ছিল করতে থাকে। সৌরেনের খুব ভদ্র মুখ করে ভদ্রলোককে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল এতই যখন ভাল ছেলেন তখন কেন গাঁড় মারাতে এলেন? করতে পারলেন না। সামনে মেয়ে আছে, বউ আছে, বয়সের ছাপ আছে, একটা ভাল চাকরি, শরীরে শপিং মলে যাওয়ার, মাল্টিপ্লেক্সে ভাল সিনেমা দেখার গন্ধ এসে গেছে। এখন এসব কথা ভাবাও পাপ।
সৌরেন বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকলেন চুপচাপ।
ট্রেন কানপুর ছেড়েছে কিছুক্ষণ আগে। লাঞ্চ দেবার কথা যখন তখন। মালিনী বাথরুমে গেল। ভদ্রলোকও গজগজ করতে করতে বাইরের দিকে গেলেন।
সৌরেন চান্দ্রেয়ীর দিকে তাকালেন, শান্ত গলায় বললেন “ছেলেটা কী করে?”
চান্দ্রেয়ী চমকাল খানিকটা, ফ্যাকাশে মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল “কোন ছেলে বলত?”
সৌরেন বাইরের দিকে তাকালেন। একঘেয়ে ক্ষেত বাড়ি, পশ্চিমবঙ্গের মত সবুজ না এসব জায়গা, রুক্ষ, তথাকথিত গো বলয়, ট্রেনের লোক জনের আচরণও অদ্ভুত এখানকার। ট্রেনকে পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে। ভাবে যা ইচ্ছা করলেই জল। মাঝে মাঝেই চেন টেনে নেমে যায়।
চান্দ্রেয়ী বলল “কোন ছেলের কথা বলছ বললে না তো বাবা?”
ভদ্রলোক ফিরে এসেছেন,গম্ভীর গলায় বললেন “রুম রিফ্রেশনার দিচ্ছে দেখলাম, এক্কেবারে সস্তা। আমাদের চাটগা ভাষায় একটা কথা আছে বুঝলেন বাবার ফুয়াদ নাই সাম ফুয়াদ খান সাফা দাড়ি। এ হল সেই”।
চান্দ্রেয়ী ফ্যাকাসে মুখে বসে আছে। সৌরেন অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন “কী মানেটা বললেন? বুঝলাম না”।
ভদ্রলোক চান্দ্রেয়ীর দিকে একবার তাকিয়ে বললেন “চলুন বাইরে গিয়ে দাঁড়াই একটু”।
মালিনী ফিরে এসেছিলেন। সৌরেন উঠলেন। মালিনী বললেন “খাবার তাড়াতাড়ি দেবে, বেশি দূর যেও না”।
সৌরেন উত্তর দিলেন না। কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে ভদ্রলোক বললেন “কথাটার মানে হল বাবার পোঙায় চামড়া নেই, আর ছেলে চাপদাড়ি রেখেছে”। বলে ভদ্রলোক অপ্রকৃতিস্থের মত হো হো করে হেসে উঠলেন।
সৌরেন হাঁ করে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
পাগল নাকি?
 


সন্ধ্যে ছ’টা বাজে। যদিও বাইরে সন্ধ্যে হবার বিন্দুমাত্র আভাস নেই। দিনের আলো যথেষ্ট। যত পশ্চিমে যাওয়া হচ্ছে, সূর্যাস্ত তত দেরী করে হবে।
ট্রেন চলছে।
শুভায়ু ঘুমাচ্ছে। তন্ময় মোবাইলে গেম খেলছে।
বাপ্পা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ঋজু চান্দ্রেয়ীকে মেসেজ করে উত্তর না পেয়ে বাপ্পার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বাপ্পা বলল “মেয়েটা এখনও কোথাও ফোন করল না?”
ঋজু বলল “আমাদের কী? দিল্লি ন’টা সাড়ে ন’টায় পৌঁছে যাব। তখন নেমে যাবে। আমাদের তো লোড নেবার কোন দরকার নেই”।
বাপ্পা গম্ভীর হয়ে বলল “মেয়েটার মুখটা খুব ইয়ে... দেখলেই কেমন হু হু করে”।
ঋজু অবাক হয়ে বাপ্পার দিকে তাকিয়ে বলল “এসব আবার কখন থেকে শুরু হল?”
বাপ্পা রেগে গেল “শুরু হবার কী আছে? পরের কথা ভাবতে হবে না?”
ঋজু বলল “দুপুরেই তো বলছিলি এসব ট্র্যাপ হতে পারে না কী সব! এই ইয়ে টিয়ে কী বলছিস তুই?”
বাপ্পা বলল “ভাবতে হবে তো। মেয়েটা তো আমাদের বিশ্বাস করছে তাই না? দেখ যারা ফ্রড করে তারা তো তোকে খাবার খাইয়ে করে। মেয়েটা তো আমাদের কিছু খাওয়াচ্ছে না। বরং আমরা যা কিনে দিয়েছি তাই খেয়ে নিচ্ছে। আমাদের বিশ্বাসও করছে। তাছাড়া তুই তো ছেলেটাকে দেখেছিস। হতেই পারে ঘটনাটা সত্যি, ছেলেটা চাপ নিতে না পেরে পালিয়েছে”।
ঋজু বলল “দেখ ভাই, যাই হোক না কেন, বেশি চাপ নেওয়ার দরকার নেই। নেমে যাবে, আমরাও বাঁচব, ব্যস”!
বাপ্পা বলল “সে তো তুই বলবিই। তোর ফোকাস তো আর এখানে নেই। তোর মন পড়ে আছে চান্দ্রেয়ীর কাছে”।
ট্রেন আলিগড়ে দাঁড়াল।
দুজনে প্ল্যাটফর্মে নামল। ঋজু বলল “তো তোর দাবীটা কী ঠিক? খুলে বল, শুনি”।
বাপ্পা কাঁধ ঝাঁকাল, “আমার কোন দাবী নেই। আমার কী বলার আছে? আমি বলছি শুধু মেয়েটার কথা আমার মিথ্যে লাগছে না”।
ঋজু বলল “ভাল তো। ট্রেন দিল্লি দাঁড়াবে, মেয়েটা নেমে যাবে ব্যস। সারাদিন স্নান করি নি, ভীষণ গরম লাগছে এমনিতেই, চান্দ্রেয়ীর মেসেজও ইরেগুলার হয়ে গেছে, এখন দয়া করে আর এসব ঝামেলা মাথায় নিস না”।
তন্ময় নেমে এল। তাদের দেখে বলল “ভুল হয়ে গেছে জানিস তো। ট্রেন টুন্ডলায় যখন দাঁড়িয়েছিল, দৌড়ে গিয়ে ওয়েটিং রুম থেকে স্নান করে চলে এলে হত”।
বাপ্পা বলল “ট্রেন ছেড়ে দিলে টুন্ডলায় খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে দাঁড়িয়ে থাকতিস? আবালের মত কথা বলিস না তো! এমনিতেই ঝাঁট ফাট জ্বলে আছে!”
তন্ময় অবাক হয়ে বলল “কেন? ঝাঁট জ্বলে আছে কেন? কী হয়েছে?”
ঋজু তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল “মামার এখন মামণিকে ইয়ে লাগছে”।
তন্ময় বড় বড় চোখ করে বাপ্পার দিকে তাকিয়ে সুর করে কেটে কেটে বলল “বো কা চো আমার!!! ভেতরে ভেতরে যে প্যার কী গঙ্গা বইছে সে তো ভাবতেই পারি নি!”
বাপ্পা রেগে গেল “এতটাও ফ্রাস্ট্রু অবস্থা না আমার। আমি মানবিকতার দিক থেকে বললাম ব্যাপারটা”।
তন্ময় বলল “মানবিকতা মারিও না বুঝেছো? ওরকম মানবিকতা মারাতে গেলে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় মারানো যায়। চেনো না জানো না একটা মেয়েকে, ম্যাক্সিমাম নিজেদের খাওয়ার থেকে ভাগ দেওয়া যেতে পারে ব্যস। এর বেশি কিছু ভাবিস না, হাম্পু হয়ে যাবে পুরো”।
ঋজু তন্ময়কে বলল “আমার মনে হয় মেয়েটাকে বলা যেতে পারে এবার ওর পিসিকে ফোন করুক। দিল্লির পরেও যদি আমাদের সঙ্গে যায়...”
ট্রেনটা নড়ে উঠল। তিনজন তড়ি ঘড়ি ট্রেনে উঠল। বাপ্পা একটু রাগী গলায় বলল “আমিই বলছি। এখনই বলছি”।
ঋজু বাপ্পার হাতে একটু চাপ দিল “বেশি খারাপ ভাবেও বলতে হবে না। দাঁড়া দাঁড়া”।
বাপ্পা বলল “কী হল?”
ঋজু বলল “আমি বলছি। তোকে বলতে হবে না। তুই তো মাঝামাঝি কিছু বলতে পারিস না। হয় দুর্ব্যবহার করে ফেলিস নইলে বেশি ভাল ব্যবহার করে ফেলিস”।
বাপ্পা বলল “বল। আমার কী? আমি মানবিকতা...”
তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বাপ্পা চুপ করে গেল।
সিটে বসে ঋজু খানিকক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটা এক ভাবে বসে আছে।
একটু গলা খাকড়িয়ে ঋজু মেয়েটাকে বলল “আপনাকে কি ও একবারও ফোন করে নি?”
মেয়েটা বিহ্বল চোখে তাদের দিকে তাকাল। তারপর বলল “না। ফোন অফ”।
ঋজু বলল “আপনি বরং এবার আপনার পিসিকে ফোন করে নিন”।
মেয়েটা ঋজুর দিকে তাকিয়ে বলল “হ্যাঁ। করছি”।
ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করল মেয়েটা। বেশ কয়েকবার একটা নাম্বারে ডায়াল করে বলল “ফোন ধরছে না”।
ঋজু বাপ্পার দিকে তাকাল। বাপ্পা বলল “ঠিকানা জানেন কোথায় পিসির বাড়ির? আপনি বাড়িতেও ফোন করতে পারেন”।
মেয়েটা বলল “বাড়িতে গেলে মেরে ফেলবে আমায়”।
বাপ্পা হাসবার চেষ্টা করল “ধুস, তা হয় নাকি? ওরম মনে হয়”।
মেয়েটা বাপ্পার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল “আপনি আমার বাবাকে চেনেন না বলে বলতে পারলেন”।
বাপ্পা ঋজুর দিকে তাকিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাল “তাহলে আপনি পিসির বাড়িতেই যান”।
মেয়েটা বলল “আমার কালকা অবধিই টিকিট আছে”।
ঋজু অবাক হয়ে বলল “কিন্তু আপনার তো দিল্লিতে পিসির বাড়ি, কালকাতে না”!
মেয়েটা উত্তর দিল না। জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তন্ময় রাগী রাগী মুখে বাপ্পা আর ঋজুর দিকে তাকাল।
 


রাত সাড়ে দশটা।
দিল্লি স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়েছে। পুরনো দিল্লি স্টেশন। কামরার অর্ধেক ফাঁকা হয়ে গিয়ে নতুন যাত্রীরা উঠেছে। সৌরেন প্ল্যাটফর্মে নেমে দাঁড়িয়েছেন।
পাশের ভদ্রলোক এসে খুশি খুশি মুখে বললেন “এবার মনের সুখে টুইট করে দিয়েছি। ইঁদুর, ট্রেন লেট, বাথরুম অপরিষ্কার, সব। দেখবেন সব সিধা হয়ে যাবে”।
সৌরেন হাসি হাসি মুখে ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। ট্রেন জার্নিতে মাঝে মাঝে অনেক বন্ধু জুটে যায়। আর মাঝে মাঝে জোটে এই ধরণের পাবলিক। একা একাই কথা বলে যাবে, বিরক্তিকর জার্নিতে এরকম বিরক্তিকর লোক সঙ্গে থাকলে মাথায় রক্ত উঠে যায়।
ভদ্রলোককে একপ্রকার অগ্রাহ্য করেই ফোন বের করে সাইড হলেন। তনয়াকে ফোন করলেন। ফোন রিং হয়ে গেল। ধরল না তনয়া।
সৌরেনের বিরক্তি বাড়ল।
খানিকটা হেঁটে একটা দোকান থেকে খবরের কাগজ কিনলেন। ট্রেন দিল্লিতে অনেকক্ষণ দাঁড়ায়।
রাতে প্যান্ট্রির খাওয়ার খেতে হবে ভেবেই বিরক্ত লাগছিল তার।
এরা যে কী করে এরকম টেস্টলেস খাবার বানাতে পারে সেটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। কোন খাবারেই স্বাদ নেই। ঝোল বানিয়ে তার মধ্যে সাদা সাদা পনীর ছেড়ে দিয়েছে।
ফোনটা বেজে উঠল। তনয়া। সৌরেন ধরলেন “ফোন ধরছিলে না কেন?”
তনয়া বললেন “রান্না করছিলাম। বল কী বলবে?”
সৌরেন বললেন “যেটা কাল বলছিলে সেটা পুরোটা বল”।
“কোনটা বলত?”
সৌরেন বিরক্ত গলায় বললেন “এমন ভাব করছ যেন কিছুই বুঝতে পারছ না। যেটা মামণের ব্যাপারে বললে কালকে, সেটা বল”।
“ওহ। যা বলার তো বলে দিয়েছি। এবার তুমি সামলাও”।
“আমি তো অর্ধেক জেনে কোন ভাবেই সামলাতে পারব না। তুমি দয়া করে খোলসা করে বল কী কী জান”। সৌরেন অধৈর্য হচ্ছিলেন।
তনয়া হাসতে হাসতে বললেন “শোন, বেড়াতে গেছ যখন তখন ঠান্ডা মাথায় থাকো। ফিরে এসে সামলিও বরং সব কিছু। তখন বলব। আমিও বুঝতে পারি মালিনীকে সারাক্ষণ সামনে দেখে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কী করবে বল, তুমি তো আর আমাকে নিয়ে যাও নি, ওকেই নিয়ে গেছো”।
সৌরেন বললেন “আমি ফিরেই যা করার করব, কিন্তু তুমি যে বললে ছেলেটা এই ট্রেনেই যাচ্ছে সেটা কি ঠিক?”
“তা ঠিক। অল্প বয়সের প্রেম। শরীরের ছোঁয়া পেয়ে গেছে। এখন কি আর কাছছাড়া করতে চায়”? তনয়া ইঙ্গিতপূর্ণ সুরে কথাটা বললেন।
সৌরেন ফোনটা কেটে দিলেন। তনয়া মাঝে মাঝে নিজের মাত্রাটা হারিয়ে ফেলে।
দাঁতে দাঁত চিপে তনয়ার উদ্দেশ্যে “ব্লাডি বিচ” বলে সৌরেন ট্রেনে উঠলেন।
তনয়া আবার ফোন করছিল। সৌরেন ধরলেন না।
মালিনী শুয়ে আছে, চান্দ্রেয়ী মোবাইল ঘাটছে।
সৌরেন চান্দ্রেয়ীর দিকে একবার তাকালেন। ঠিক করলেন এখন আর কিছু বলবেন না।
মালিনী বললেন “কাল ক’টায় নামব আমরা?”
সৌরেন বললেন “ট্রেন লেট যাচ্ছে। একদিকে শাপে বর। রাত থাকতে থাকতে নামতে হবে না”।
মালিনী বললেন “তোমরা খেয়ে নাও। আমার আর খেতে ইচ্ছা করছে না”।
সৌরেন বললেন “আমিও খাব না”।
মালিনী মেয়ের দিকে তাকালেন “তুই খেয়ে নে”।
চান্দ্রেয়ী বলল “আমারও খিদে নেই”।
সৌরেন মেয়ের দিকে তাকালেন “খেয়ে নে। সকালে ব্রেক ফাস্ট কখন করব, কোন ঠিক নেই”।
চান্দ্রেয়ী বাবার দিকে একবার তাকিয়ে ট্রেনের খাবারের প্যাকেটগুলো খুলল।
সৌরেন নিজের আপার বার্থে উঠলেন। তনয়া মেসেজ করেছে “হাজার দশেক টাকা আরও লাগবে, কাল পাঠালে ভাল হয়”।
ভ্রু খানিকটা কুঁচকাল তার। তনয়াকে যা টাকা দেবার দিয়ে এসেছিলেন তিনি। দিন যত যাবে তাদের সম্পর্কটা কি খানিকটা ব্ল্যাকমেলিংএর দিকে এগোবে? মামণের পিছনেই বা গোয়েন্দা লাগিয়েছে কেন তনয়া?
মালিনী বললেন “শোন, একটু খেয়ে নাও। একবারে খালি পেটে থাকাও ঠিক না”।
সৌরেন বললেন “তুমি খাও। আমার ভাল লাগছে না”।
মালিনী বললেন “ভাত খাবে না একটা রুটি খেয়ে যাও”।
সৌরেন আবার নামলেন। মালিনী উঠে বসেছে।
সৌরেন বললেন “প্ল্যানের খানিকটা চেঞ্জ করেছি। আমরা কালকায় নামব না। চণ্ডীগড়ে নামব”।
কথাটা বলেই সৌরেন চান্দ্রেয়ীর দিকে তাকালেন।
চান্দ্রেয়ী একবার বাবার দিকে তাকিয়েই খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
মালিনী বিরক্ত গলায় বললেন “এ আবার কখন ঠিক করলে? একেক সময় একেক রকম হলে তো মুশকিল! চন্ডীগড় থেকে সিমলা যাবে?”
সৌরেন মালিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন “হ্যাঁ। এই ঠিক করলাম। এতক্ষণ এটাই দেখছিলাম। গাড়িতেই যখন যাব তখন সরাসরি চণ্ডীগড় নেমেই যাই। আবার একটা জিনিসও করা যায়। সিমলা গেলামই না। মানালি চলে গেলাম আগে”।
মালিনী ব্যাজার মুখে বললেন “যা ইচ্ছা কর। শুধু মনে রেখো, আমাকে বেশি টানা হ্যাচড়া করবে না। আমার এসব পোষায় না একদম”।
সৌরেন বললেন “আমি ডেকে দেব তোমাদের, চিন্তা কোর না”।
চান্দ্রেয়ী চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল। কোন কথা বলল না।
...

 

বাকিটা পড়তে প্রি বুক করুন "পথ হারাবো বলেই"... 

বইটি সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে